গত জানুয়ারির শেষ শুক্রবার নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মুক্তি পায় গণ-অর্থায়নে নির্মিত সিনেমা ‘সাঁতাও’। তিস্তার তীরবর্তী মানুষের আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত হয়েছে এ সিনেমা। খন্দকার সুমন পরিচালিত এ সিনেমা নিয়ে দর্শকমনে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল এর ট্রেলার দেখেই। সিনেমাটির গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন নির্মাতা নিজেই। ‘সাঁতাও’ একটি রংপুরি শব্দ। উত্তরাঞ্চলে এ শব্দের মাধ্যমে সাতদিন ধরে লাগাতার বৃষ্টি হওয়াকে বোঝায়। সে বিষয়কে মুখ্য করে সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন খন্দকার সুমন।
লালমনিরহাটের তিস্তা বাজার এলাকায় পরিচালকের বেড়ে ওঠা। তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ অঞ্চলের মানুষ। তাই এর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন চিত্রায়ণের প্রয়াসেই নির্মিত হয়েছে খন্দকার সুমনের এ সিনেমা। আর তিনি বেছে নিয়েছেন আঞ্চলিক শব্দটি, যা ওই বিশেষ অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করে। মানুষের গল্প বলে এবং পর্দায় বেশ নিপুণভাবে সে গল্প উঠে এসেছে। নৌকা বাইচ, তিস্তার জল ঢুকে পড়া, বন্যা, খরা, পশুর প্রতি মমতাসহ ওই অঞ্চলের মানুষের জীবনের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে সিনেমায়।
সাঁতাও সিনেমার অন্যতম একটি উপাদান প্রকৃতি ও এর বৈচিত্র্য। সেই সঙ্গে আবহাওয়ার পালাবদল ছিল গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সিনেমাজুড়েই আছে নদীপাড়ে মানুষের জীবনযাপন, নানা রকম পশু-পাখির চলাচল। নির্মাতা বন্যা, খরা, মাঠের ফসল এবং ঋতু পরিবর্তনের প্রতিটি বিষয় ক্যামেরাবন্দি করেছেন। যার ফলে দৃশ্যগুলো দর্শকের চোখের আরামের সঙ্গে আলাদা আবেদন তৈরি করেছে। এছাড়া বিস্তীর্ণ অঞ্চল আরো ভালোভাবে পর্দায় দেখাতে ড্রোনের ব্যবহার প্রশংসার দাবিদার। অনেক ক্ষেত্রেই পর্দায় একটি দৃশ্য বা ঘটনা প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগেই নির্মাতা তাড়াহুড়া করেছেন বলে মনে হয়েছে। ফলে কিছু সময়ের জন্য হলেও খেই হারিয়ে গেছে। তবে উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এত নিপুণভাবে দেখানো হয়েছে যে এ ক্ষুদ্র বিষয়ও ছাপিয়ে যাচ্ছিল। অন্যদিকে গল্প বলার ঢঙ আর ঘটনা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যে তাগিদ, শক্তভাবেই তা দর্শককে আটকে রাখছিল।
ফজলু নামের একজন কৃষক এ সিনেমার মূল চরিত্র। এ চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফজলুল হক। দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে তার ফসল উৎপাদনের নানা কাজের সঙ্গে। আর তার স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আইনুন পুতুল। তাদের জীবনের ঘটে যাওয়া নানা ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এগিয়ে যায় সিনেমা। সন্তানহারা পুতুলের মাতৃত্ববোধের ছোঁয়া পায় তাদের পালিত একমাত্র বাছুর। গৃহপালিত প্রাণীর প্রতি মমতাবোধ সিনেমাটিতে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। ‘সাঁতাও’ দেখায় একটি কৃষক পরিবারে গৃহপালিত পশুও কীভাবে পরিবারের অংশ হয়ে ওঠে।
একটি সিনেমার গল্পই কেবল সেটিকে সাবলীল করে না, বরং অভিনয়ও গল্পকে আরো জোরদার করে। এ সিনেমার কলাকুশলীদের অভিনয়ের দক্ষতা বারবারই দর্শককে মুগ্ধ করেছে। ফজলুল হক, আইনুন পুতুল ও আব্দুল্লাহ আল সেন্টুসহ প্রত্যেকের অভিনয় ছিল প্রশংসা পাওয়ার মতো। পর্দায় তারা প্রকৃতপক্ষেই ওই চরিত্রগুলো হয়ে উঠতে পেরেছেন। চরিত্রগুলোর আবেগ, কঠোরতা ও চঞ্চলতা কুশীলবেরা নিপুণভাবেই উত্থাপন করতে পেরেছিলেন। এ সিনেমায় বেশকিছু নিষ্পাপ আর করুণ পরিস্থিতি রয়েছে, যেসব দৃশ্য সহজভাবেই উতরে গিয়ে দর্শকের মনে ঠাঁই করে নিতে পেরেছেন অভিনেতারা।
অন্যদিকে সিনেমার প্রপস। অভিনেতা-অভিনেত্রীর বাইরেও পর্দায় সিনেমাকে আরো বাস্তব করে তুলতে যেসব উপকরণ ব্যবহার হয় তাকে প্রপ বলা হয়। আর একের অধিক ব্যবহার করা হয় বলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রপকে প্রপস বলা হয়। এ সিনেমায় প্রপসের যথোপযুক্ত ব্যবহার প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার। তবে দ্রুত ঘটনার দিক পরিবর্তন করতে গিয়ে একটু তাড়াহুড়া চোখের আরামে কিছুটা বিঘ্ন ঘটালেও নতুন ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরিত্রগুলোর চলাচল সিনেমার ছন্দ ফিরিয়ে দিয়েছে।
এবার একটু কথা বলা যাক সাঁতাওয়ের আবহসংগীত ও গান নিয়ে। এ সিনেমার সবচেয়ে আলাদা করা বিষয় হলো এর ভাষা ও গানের ব্যবহার। বিয়ের ও আঞ্চলিক গানগুলো দেশের সংস্কৃতি ও ওই অঞ্চলের মানুষের আনন্দ-বেদনা তুলে ধরেছে। এছাড়া আবহসংগীত ঘটনার সঙ্গে চমৎকারভাবে মানিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, সাঁতাও নির্মাণের পেছনে পরিচালকের অক্লান্ত পরিশ্রম চোখ এড়িয়ে যাবে না দর্শকের। নিজের মতো করে ভিন্নভাবে তিনি গল্প বলতে চেয়েছেন। গল্পের মাধ্যমে তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, হাসি-কান্না নিবিড়ভাবে উঠে এসেছে। সেই সঙ্গে ভালোবাসা ও পরিস্থিতির সংকটগুলোও সিনেমাটিকে প্রাণ দিয়েছে।










