১৯৩০-এর দশকের শুরুর দিকের কথা। ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, মজুরি কমে যাচ্ছে, চারদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের মিছিল—এসব বাস্তবতা চিত্রশিল্পীদের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। তারা বসে থাকতে পারেননি। সে সময়ের বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠিত হন একদল ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী। তারা সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা ও রাজনৈতিক প্রচারের উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করেন। এভাবেই গড়ে ওঠে ‘আর্টিস্টস ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন (এআইএ)’। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে ছিলেন পিয়ার্ল বাইন্ডার, ক্লিফোর্ড রো, মিশা ব্ল্যাক, জেমস ফিটন, জেমস বসওয়েল, জেমস হল্যান্ড, এডওয়ার্ড অ্যারডিজোন, পিটার ল্যাসলো পেরি ও এডিথ সাইমন। তাদের বেশির ভাগই শ্রমজীবী পরিবার থেকে উঠে আসা শিল্পী এবং মহামন্দার সংকট ও হতাশার জীবন পার করছিলেন। তাদের মধ্যে পিয়ার্ল বাইন্ডার ও ক্লিফোর্ড রো সোভিয়েত ইউনিয়নে শ্রমিক সমবায় দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

প্রথমে সংগঠনটির নাম ছিল ‘আর্টিস্টস ইন্টারন্যাশনাল’। এ সংগঠনের মাধ্যমে একদিকে রাজনৈতিক প্রচার চালানো হয়, অন্যদিকে মার্ক্সবাদী আলোচনা, প্রদর্শনী আয়োজন, যুদ্ধ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী কার্যক্রমও করা হয়। কিন্তু সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকলে এবং ফ্যাসিবাদের হুমকি প্রবল হলে ১৯৩৫ সালে নাম বদলে রাখা হয় ‘আর্টিস্টস ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন (এআইএ)’। এ পরিবর্তনের মাধ্যমে আরো বেশি মতাদর্শিক বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হয়। একই সময়ে আমেরিকায়ও শিল্পীরা একই রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে কমিউনিজমকে সরাসরি তুলে না ধরে বরং ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য গড়ে তোলা হবে। তবে সংগঠনের ভেতরে কেউ কেউ মনে করতেন, এতে মূল লক্ষ্য দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

অ্যান্ডি ফ্রেন্ড তার ‘কমরেড ইন আর্টস: আর্টিস্টস অ্যাগেইনস্ট ফ্যাসিজম ১৯৩৩-১৯৪৩’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, এ বিতর্কগুলো আসলে আজকের মতোই, ‘বামপন্থীরা কতটা মূলধারার উদারনীতির সঙ্গে আপস করবে?’ তা-ই শেষ কথা। তবে তিনি সরাসরি বর্তমানের সঙ্গে তুলনা করেননি; বরং কেবল তখনকার ঘটনাগুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন।

22

চিত্রশিল্পীদের প্রতিবাদী কর্মসূচির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো ১৯৪০ সালের এআইএর প্রদর্শনী ‘দ্য ফেস অব ব্রিটেন’। প্রদর্শনী শুরু হওয়ার কথা ছিল ১৩ সেপ্টেম্বর। কিন্তু তার কয়েক দিন আগে ৭ সেপ্টেম্বর জার্মানি লন্ডনে বিমান হামলা শুরু করে। একপর্যায়ে দুটি বোমা প্রদর্শনী গ্যালারির ছাদ ভেদ করে এবং ভেতরের মেঝে ও কিছু ছবি নষ্ট হয়ে যায়। এ ঘটনায় প্রদর্শনী এক সপ্তাহ পেছানো হয়। ঝুঁকির মধ্যেও কয়েকজন শিল্পী প্রদর্শনী আবার সাজিয়ে তোলেন। এ যেন যুদ্ধের মাঝেই স্বাভাবিক জীবন ধরে রাখার চেষ্টা।

যুদ্ধের সময় শিল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বেড়ে যায়। দোকান ফাঁকা, রেস্তোরাঁয় মানুষ কম, খেলাধুলাও বন্ধ—এমন অবস্থায় শিল্পই মানুষের জীবনে আনন্দ আর স্বস্তি এনে দিয়েছিল। জীবন ছিল অনিশ্চিত, তাই শিল্প হয়ে উঠেছিল টিকে থাকার শক্তি।

এআইএতে অনেক নামকরা আন্তর্জাতিক শিল্পী—যেমন পাবলো পিকাসো, স্টুয়ার্ট ডেভিস ও দিয়েগো রিভেরা—যুক্ত ছিলেন। অবশ্য এআইএ ইতিহাসে খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। কারণ তারা নতুন কোনো শিল্পধারা (যেমন কিউবিজম বা ফিউচারিজম) তৈরি করেননি। বরং তারা সামাজিক বাস্তবতাবাদে ভর করে রাজনৈতিক কাজে মনোযোগ দিয়েছিলেন। তাদের স্লোগানই ছিল ‘শিল্পে রক্ষণশীল, রাজনীতিতে বিপ্লবী।’

এ সময় এআইএ নানা উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে শিল্পীদের সংগঠিত করা, প্রিন্ট ও লিথোগ্রাফের মাধ্যমে শিল্পকে সুলভ করে তোলা, লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনে প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই তা দেখতে পারে।

ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের সময় এআইএ শিল্পকে শুধু অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেনি, বরং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ হিসেবেও তুলে ধরেছিল। এ কার্যক্রম যুদ্ধাক্রান্ত ও অনিশ্চিত বাস্তবতায় মানুষকে সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদী করেছিল।

[আর্টনিউজ ডটকমে প্রকাশিত লুইস বেরির ‘হাউ আর্টিস্টস রেসিস্টেড ফ্যাসিজম আ সেঞ্চুরি অ্যাগো’ অবলম্বনে]