দৃশ্যকলার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় রেখা কেবল প্রাথমিক মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা হয়ে উঠেছে সময়, সমাজ ও মনস্তত্ত্বের গভীরতম ভাষ্য। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘আনব্রোকেন লাইন’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি সেই রূপান্তরকেই ধারণ করেছে অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে। ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এ প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান, এসএম সুলতানসহ ৪২ শিল্পীর শিল্পকর্ম। কোথাও রফিকুন নবীর চারকোলের আবছা ও মাখানো টান, কোথাও শাহাবুদ্দিনের তুলির সাবলীল গতি, আবার কোথাও বিপাশা হায়াতের জলরঙের অনায়াস প্রকাশ। অর্থাৎ গত সাত দশকে বাংলাদেশের শিল্পভাবনায় রেখার শক্তি কীভাবে কালক্রমে পরিবর্তিত, পরিমার্জিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে, তারই এক অনন্য ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক জরিপ এ প্রদর্শনী।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের একটি স্কেচে অল্প কয়েকটি ঋজু ও স্বতঃস্ফূর্ত রেখার টানেই তুলে ধরেছেন লোকায়ত জীবনের এক মর্মস্পর্শী চিত্র। সাদামাটা কাগজের পটভূমিতে অত্যন্ত মিতব্যয়ী রেখার ব্যবহারে চিত্রকর্মটিতে দেখা যায় একজন গ্রামীণ জননীকে, যিনি তার সন্তানকে পিঠে রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। তার শরীরের প্রতিটি বাঁকে দৈনন্দিন ক্লান্তির ছাপের পাশাপাশি রয়েছে মাতৃত্বের পরম সুরক্ষা ও আত্মত্যাগের অবিচল রূপ। চিত্রকর্মটির ওপরের ডান কোণে শিল্পীর নিজস্ব স্বাক্ষর ও তারিখের উপস্থিতি এ ঐতিহাসিক কাজটিকে আরো প্রামাণ্য ও আবেগঘন করে তোলে, যা দর্শককে মুহূর্তের জন্য ১৯৫০ বা তার আশপাশের গ্রামীণ বাংলার বাস্তবতায় নিয়ে যায়।
অন্যদিকে জান্নাতুন নূর সায়মুমের চিত্রকর্মগুলো যেন মানুষের একাকিত্ব, ধ্যানমগ্নতা কিংবা নিজেদের ভেতরে ডুব দেয়ার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। তার একটি চিত্রে মানুষ ও পাখিকে এমনভাবে যুক্ত করেছেন, যাতে ফুটে ওঠে স্বাধীনতার প্রতি মানুষের সহজাত আকর্ষণ। মানুষের হৃদয়ও পাখির মতোই মুক্ত আকাশে ডানা মেলতে চায়। কিন্তু সামাজিক শৃঙ্খল, ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা কিংবা নানা পারিপার্শ্বিকতার বেড়াজালে সেই আকাঙ্ক্ষা বারবার আটকে যায়। মুক্তির জন্য হৃদয়ের তীব্র আকুলতা এবং বাস্তবতার কাছে তার অসহায় আত্মসমর্পণের দ্বন্দ্বই যেন শিল্পী ফুটিয়ে তুলেছেন এখানে।
পেনসিল স্কেচে শেড ও রেখার সূক্ষ্ম বিন্যাসের মাধ্যমে সিনথিয়া আক্তার সুমনা তার চিত্রকর্মগুলো এঁকেছেন। সেখানে মানুষের মাথার খুলি ও প্রোফাইলের ভেতর জট পাকানো রেখা এবং কাঁচির মতো প্রতীকের ব্যবহার চোখে পড়ে। এসব উপাদানের মধ্য দিয়ে শিল্পী মানুষের মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন, আত্মগত দ্বন্দ্ব ও মনের ভেতরকার জটিলতাকে দৃশ্যমান করে তোলেন। ছবিগুলো যেন অস্থিরতা ও মানসিক সংঘাতের ইঙ্গিত করে।
কামরুল হাসানের একটি কাজ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে এক দর্শকের। সেই দর্শকের চোখে, কাজটির প্রধান বিশেষত্ব লুকিয়ে রয়েছে এর প্রতিকৃতির বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায়। ছবিটির সামনে দাঁড়ালে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক টান অনুভূত হয়। ক্যানভাসের দিকে তাকালে মনে হয়, ছবিতে ফুটিয়ে তোলা মানুষটি যেন নিজেকেই পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেছেন, যা আত্মমগ্নতা ও অন্তর্মুখী নিঃসঙ্গতার এক নিঃশব্দ প্রকাশ। আবার ঠিক পরের মুহূর্তেই দৃষ্টি বদলালে মনে হয়, সেই একই অবয়ব যেন আলিঙ্গন করছে অন্য কাউকে; যা সংযোগ, প্রেম কিংবা একাকিত্ব থেকে মুক্তির এক আকুতি।
এর পাশেই রয়েছে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর ২০০১ সালের একটি কাজ। সেখানে দেখা যায় খোলা চুলের এক নারীকে। নারীটির মুখের শান্ত অভিব্যক্তি যেন কোনো সুদূর স্মৃতির কিংবা আত্মোপলব্ধির ইঙ্গিত দেয়। আর তার আশপাশে থাকা প্রস্ফুটিত ফুলগুলো এবং পটভূমির ছোট ছোট রেখাচিত্র পুরো কম্পোজিশনে এক কাব্যিক ও স্নিগ্ধ আবহ তৈরি করেছে।
প্রদর্শনীতে নিজের কাজ নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের শিল্পী রিকেল চাকমা বলেন, ‘এ প্রদর্শনীতে আমার কাজ নিয়ে আমার অনুভূতি ভালো লাগার চেয়েও বেশি গর্বের বিষয়। কারণ একজন আদিবাসী হিসেবে আমাকে সবসময় অন্যদের থেকে পিছিয়ে থেকে শুরু করতে হয়। প্রচলিত গণ্ডির বাইরে আমার শিল্পকর্মগুলো আদিবাসী বিভিন্ন বিষয়কে ফোকাস করে। ফলে এ প্রদর্শনীতে বাকি ৪১ জন শিল্পীর সঙ্গে একটা প্রদর্শনীতে সুযোগ পাওয়া আমার জন্য সম্মানের ও গর্বের।’
প্রচলিত চিত্রমাধ্যমের বাইরে গিয়ে সুই-সুতাকে নিজের অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন শিল্পী নূরে আমেনা মনি। ফ্রেমে টানানো কাপড়ের ওপর সুই-সুতার বুননে ফুটিয়ে তুলেছেন নিজের অভিব্যক্তি। এছাড়া রয়েছে শিল্পী যোগেন চৌধুরীর কাগজের ওপর অয়েল প্যাস্টেল রঙে আঁকা রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম।
শিল্পীদের কাজগুলোর ওপর সামগ্রিক দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায়, পুরনো প্রজন্মের শিল্পীদের রেখায় যেখানে গ্রামীণ জনপদের জীবনসংগ্রাম, লোকায়ত ঐতিহ্য ও নিসর্গের আবহ নিখাদ সাবলীলতায় ফুটে উঠেছে, সেখানে পরবর্তী ও বর্তমান প্রজন্মের কাজগুলোতে এসেছে আধুনিক মনস্তত্ত্ব, পরাবাস্তবতা, নাগরিক যন্ত্রণার রূপক এবং ডিজিটাল ও ধারণাগত বা কনসেপচুয়াল শিল্পের নানা নিরীক্ষা।





