বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘এবারের নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। এ নির্বাচন জাতির কিসমতকে সঠিক রাস্তার ওপর দাঁড় করিয়ে দেয়ার নির্বাচন। দেশ আজাদি না গোলামির পথে যাবে সেই সিদ্ধান্ত হবে এ নির্বাচনের মাধ্যমে।’
গতকাল দুপুরে ময়মনসিংহের সার্কিট হাউজ মাঠে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি সম্পদসমৃদ্ধ দেশ। উর্বর মাটি, পরিশ্রমী মানুষ, পানি ও ভূগর্ভে বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দেশ আজও সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। ১৯৪৭ ও ১৯৭১ দুইবার স্বাধীনতা অর্জনের পরও ৭৭ বছরে জাতি কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর জন্য দায়ী অসৎ ও ধোঁকাবাজ নেতৃত্ব, যারা জনগণকে বোকা বানিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করেছে।’
তিনি বলেন, ‘দেশের পাসপোর্টের মর্যাদা আজ দুর্বল। অনেক জায়গায় দেশের পরিচয় দিতে মানুষ লজ্জাবোধ করে। এ অবস্থার জন্য দায়ী বিগত ৫৪ বছরের ব্যর্থ নেতৃত্ব।’
ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, ‘এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর কৃষিতে বিপ্লব হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় বাজেট ও জনবল না থাকায় সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। তারপরও এ বিশ্ববিদ্যালয় দেশকে অনেক কিছু দিয়েছে।’ তিনি ঘোষণা দেন, আগামী ১২ তারিখ থেকে জনগণের ভোটে যদি ইনসাফের পক্ষে রায় আসে এবং ১১ দল দেশসেবার সুযোগ পায়, তবে এ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জাতি গড়তে হলে মানসম্মত শিক্ষা প্রয়োজন। অথচ বাজেটে শিক্ষাকে অবহেলা করা হয় এবং দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে অসৎ লোকদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেয়া হয়। ফলে শিক্ষা ও গবেষণা খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘দেশের টাকা লুট করে যারা বিদেশে আরাম-আয়েশে বসবাস করছে, তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। চোরদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। ক্ষুধার তাড়নায় যারা ছোটখাটো অপরাধে জড়ায়, তাদের নয়, বড় লুটেরাদের ধরতে হবে।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘দেশের যুবক-যুবতী, তরুণ সমাজ, এমনকি মা-বোন ও শিশুরাও পুরনো রাজনীতি আর চায় না। তারা পরিবারতন্ত্র, দলীয় দখলদারত্ব ও ধান্দাবাজ রাজনীতির বাইরে একটি নতুন বাংলাদেশ দেখতে চায়।’
তিনি বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে দুটি মূল্যবান ভোট রয়েছে। প্রথম ভোট হবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’। হ্যাঁ মানে আজাদী, না মানে গোলামি। জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ন্যায়ের পক্ষে, ইনসাফের পক্ষে থাকার।’
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতের আমির ও সদর-৪ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাওলানা কামরুল আহসান এমরুল। সঞ্চালনা করেন মহানগর সেক্রেটারি অধ্যাপক শহীদুল্লাহ কায়সার। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও প্রচার-মিডিয়া সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মঞ্জরুল ইসলাম ভুঁইয়া। আরো বক্তব্য দেন খেলাফত মজলিশের ময়মনসিংহ জেলা আমির মাওলানা নজরুল ইসলাম, ১১-দলীয় জোটের বিভিন্ন আসনের প্রার্থী ও জামায়াতের কেন্দ্রীয়, জেলা ও মহানগর নেতারা।
কিশোরগঞ্জে জনসভা: কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, কটিয়াদী উপজেলায় গতকাল সকালে কটিয়াদী সরকারি কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা জামায়াতে ইসলামীর দলীয় সরকার কায়েম করতে চাই না। জামায়াতে ইসলামীর বিজয়ও আমি চাই না, আমরা ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। ১৮ কোটি মানুষের বিজয় হলে সে বিজয় হবে আমাদের সবার। দল-গোষ্ঠী ও পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির বিজয় আমাদের কাছে নেই। এ ভোটে পুরনো রাস্তায় যারা হাঁটতে চাইবে, অন্ধকার গলিতে তারা তাদের রাস্তায় হাঁটুক। আমরা সদর রাস্তায়, আলোকিত রাস্তায় হাঁটব।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘আমার এক্স আইডি হ্যাক করে সেখান থেকে অত্যন্ত নোংরা মেসেজ দেয়া হয়েছে। আমদের সাইবার টিম সেটা দ্রুত রিকভারি করে ব্যবস্থা নিয়েছে, পেয়েও গেছে কোন জায়গা থেকে কারা এটি করেছে। আশ্চর্যের বিষয় সবকিছু স্পষ্ট হওয়ার পরও একটি রাজনৈতিক সংগঠন (দল) এটা নিয়ে এখন ব্যবসা করছেন।’
তিনি বলেন, ‘মা-বোনদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। মায়ের গর্ভে থেকে আমরা বড় হয়েছি, মায়ের দুধ খেয়েছি। মায়ের কাছে লালিত-পালিত হয়েছি। মায়ের স্নেহ-যত্ন, আদরে-ভালোবাসায় লেখাপড়া করেছি। এ মায়ের কোনো ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদেরকে কৃতজ্ঞচিত্তে তা পরিশোধ করার চেষ্টা করতে হবে। জুলাই আন্দোলনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন উচ্ছৃঙ্খল সন্ত্রাসীরা আমাদের মেয়েদের গায়ে হাত দেয়া হয়েছিল, সেদিনই দেশে আগুন জ্বলে উঠেছিল। মানুষ সবকিছু সহ্য করতে পারে, কিন্তু তার মায়ের অপমান সহ্য করতে পারে না।’
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার আমির অধ্যাপক রমজান আলী।
কুড়িগ্রাম যাচ্ছেন আজ: কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ ১১-দলীয় জোট নেতারা কুড়িগ্রাম আসছেন আজ। সকাল ৯টায় কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে জোটের জনসভায় বক্তব্য দেবেন ডা. শফিকুর রহমান। একই মঞ্চে বক্তব্য রাখবেন এনসিপির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণ অঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ অন্যরা।










