দেশের গুরুত্বপূর্ণ দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাটের মোট ছয় কিলোমিটার এলাকা স্থায়ীভাবে আধুনিকীকরণের জন্য গত বছরের জানুয়ারিতে দায়িত্ব পায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বোর্ডকে ৬৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে কাজটি সমাপ্ত করার দায়িত্ব দেয়। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে এ কাজ শুরু করা যায়নি। আবার সময়ের ব্যবধানে বেড়েছে প্রকল্প ব্যয়। এখন এ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। পাশাপাশি পাউবোর দেয়া নকশা বিশ্লেষণ করতে পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট)। ফলে আদতে নকশাবন্দি হয়ে আছে প্রকল্পটির কাজ। কবে নাগাদ এর কাজ শুরু হবে, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ।

পাউবোর রাজবাড়ী কার্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাট আধুনিকীকরণ প্রকল্পটি ২০২১ সালে বোর্ডকে হস্তান্তর করে বিআইডব্লিউটিএ। সে সময় বলা হয়, নদীর দৌলতদিয়া প্রান্তে ৭ নম্বর ফেরিঘাট থেকে লঞ্চঘাট হয়ে দেবগ্রাম পর্যন্ত চার কিলোমিটার এলাকার জন্য ৫১০ কোটি ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটে দুই কিলোমিটার এলাকার জন্য ১৭০ কোটিসহ মোট ৬৮০ কোটি টাকা ডিপিপিতে অনুমোদন করা হয়েছে।

কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শুরু করতে পারেনি পাউবো। আবার গত ডিসেম্বরে নকশায় কিছু পরিবর্তন আনে বিআইডব্লিউটিএ। ঘাটের প্রতিটি পন্টুনে তিনটি করে স্তর তৈরির চাহিদা দেয়া হয়। অর্থাৎ হাই ওয়াটার, মিড ওয়াটার ও লো ওয়াটার লেভেলের ঘাট তৈরি করতে বলা হয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও নকশা পরিবর্তনের কারণে যার নতুন ব্যয় ধরা হয়েছে দৌলতদিয়া প্রান্তে ৮৫০ কোটি ও পাটুরিয়া প্রান্তে ৪০০ কোটি টাকা। এর একটি নকশা তৈরি করে পাউবো পাঠিয়েছে বিআইডব্লিউটিএকে। বিআইডব্লিউটিএ আবার সেই নকশা যাচাই করার জন্য পাঠিয়েছে বুয়েটকে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের এটুকুই অগ্রগতি। এরপর কবে বুয়েটের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হবে, কবে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ পেয়ে কাজ শুরু হবে, সে সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেনি কোনো কর্তৃপক্ষ।

গত বছরের জানুয়ারিতে প্রকল্পটির দায়িত্ব পেলেও কেন সে সময় কাজ শুরু করা হয়নি, তার কোনো সদুত্তর নেই পাউবোর কাছে। এ প্রসঙ্গে পাউবো রাজবাড়ীর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান অঙ্কুর কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, নকশা পরিবর্তন ও দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণে নতুন করে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে, যা বুয়েটে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

গত সপ্তাহে ঈদযাত্রার পারাপার নির্বিঘ্ন করতে আয়োজিত সমন্বয় সভায় প্রকল্প শুরু না হওয়া ও নদীভাঙনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ কাজী কেরামত আলী। তিনি বিষয়টি নিয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও জানান। সে সভাতেই প্রকল্পের বর্তমান পরিস্থিতির কথা জানায় পাউবো। সে সময়ই বলা হয়, ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ও নকশা পরিবর্তনের কারণে এখনো কাজটি শুরু করা যায়নি।

অন্যদিকে সর্বশেষ চার বছরে পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়েছে দৌলতদিয়ার ১৮টি গ্রাম। নতুন করে লঞ্চঘাট এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে স্থানীয় মানুষ। ঝুঁকিতে রয়েছে ২৫০টি বসতবাড়ি, দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট, ফেরিঘাটসহ বহু স্থাপনা। সামনের বর্ষা মৌসুমের জন্য জিও ব্যাগ ছাড়া আর কোনো প্রস্তুতি নেই পাউবোর।

গতকাল সকালে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট সংলগ্ন নালু মণ্ডলের পাড়া এলাকার গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে ভাঙন। এ ঝুঁকিতে রয়েছে নালু মণ্ডলের পাড়া এলাকার অন্তত ২৫০ পরিবার। তাছাড়া মারাত্মক ঝুঁকির মুখে দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট, ১, ২, ৩ ও ৭ নম্বর ফেরিঘাট। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রত্যেকেই জানালেন, ভাঙনের ঝুঁকি নিয়েই দিন পার করতে হচ্ছে তাদের। তাদের অনেকেরই ঘরবাড়ি আগেও পদ্মায় বিলীন হয়েছে। নতুন ভাঙন তাই তাদের জন্য নতুন আতঙ্ক নিয়ে হাজির হয়েছে।

দৌলতদিয়া লঞ্চঘাটের ব্যবসায়ী মো. সাচ্চু ব্যাপারী বলেন, প্রতি বছরই মাপজোক হয়। কিন্তু কাজ হয় না। চার বছর ধরে স্থায়ী কাজ হবে বলে শোনা যাচ্ছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন এখনো দেখা যায়নি। বিআইডব্লিউটিএ ও পাউবোর কর্মকর্তারা পানি বাড়লে কেবল জিও ব্যাগ ফেলে দায় সারেন। পরে আর তাদের খোঁজ পাওয়া যায় না। সে কারণেই বারবার দৌলতদিয়া ঘাট ভাঙনের কবলে পড়ে।

দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটে ব্যবসা করেন ওসিরত মোল্লা। তিনি বলেন, সামান্য পানি বাড়তেই লঞ্চঘাট ও ৭ নম্বর ফেরিঘাটের উজানে ভাঙন শুরু হয়েছে। পানি বাড়লে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে। এখনই জিও ব্যাগ ফেলা প্রয়োজন। পাউবো বা বিআইডব্লিউটিএ জিও ব্যাগ ফেলা শুরু করবে যখন নদীতে স্রোত বেশি হবে, ভাঙনের মাত্রাও বেশি হবে।

এসব বিষয়ে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান অঙ্কুর জানান, জিও ব্যাগ ফেলা স্থায়ী সমাধান নয়। তার পরও ভাঙনরোধে এ বছরও জিও ব্যাগ ফেলা হবে। ভাঙন রোধে সাধ্যমতো চেষ্টা করা হবে।