শীতে হাঁসের মাংস ও ছিটরুটি খাওয়ার চল আছে সারা দেশেই। একইভাবে চুইঝালের সঙ্গে আস্ত রসুন অথবা নারকেলের দুধ দিয়ে হাঁসের মাংস রান্না খুলনা অঞ্চলের ঐতিহ্য। এর প্রচলনও দীর্ঘদিনের। যত দিন যাচ্ছে, ততই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে হাঁসের মাংস। সপরিবারে কিংবা একসঙ্গে তরুণরা মিলে পিকনিক-বনভোজন অথবা কোনো অনুষ্ঠানে হইচই করে হাঁসের মাংস খাওয়া অনেকটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

সামাজিক অনুষ্ঠানেও এখন হাঁসের মাংস রাখা হয়। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোও বিভিন্ন দিবসে হাঁসপার্টির আয়োজন করছে। হাঁসের মাংস পাঠানো হচ্ছে দেশের বাইরের আত্মীয়-স্বজনের কাছেও। আবার অনেকে পদ-পদবির তদবির হিসেবেও হাঁসপার্টির আয়োজন করেন। পদ পাওয়ার পরও হয় পার্টি।

অনেকে শীতে হাঁসের মাংস খাওয়ার জন্য গ্রামে আসেন। আত্মীয়-স্বজন অথবা জামাই এলে ওইসব বাড়িতে পড়ে যায় হাঁস খাওয়ার ধুম।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অরুণ কান্তি মণ্ডল জানান, শীত এলেই এ অঞ্চলে চলে হাঁসের মাংস খাওয়ার উৎসব। চাহিদার কারণে হাঁস বেচাকেনা, প্রতিপালন সব মিলে আগের চেয়ে বাণিজ্যিকভাবে হাঁসের উৎপাদনও বেড়েছে। প্রায় প্রতি বাড়িতে হাঁস পালন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে হাঁসের খামার। এছাড়া প্রায় সব বাড়িতেই নারীরা হাঁস পালন করেন।

 জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, খুলনায় ১০০-১০০০ হাজার হাঁস পালন হয়—এমন খামার আছে ৫০০টি। ২০২০ সালে জেলায় প্রায় ১০ লাখ হাঁস প্রতিপালন করা হয়। বর্তমানে সে সংখ্যা বেড়ে এখন ১২ লাখ ছাড়িয়েছে। শীত মৌসুমে এ অঞ্চলে এখন ২০ কোটি টাকার হাঁস বেচাকেনা হয়।

তিনি আরো জানান, খুলনার কয়েকটি রেস্তোরাঁ হাঁসের মাংসের জন্য জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এখানে সারা বছরই মেলে হাঁসের মাংস।

খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলা বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের গোলাম হাসান জানান, তার খামারে এক হাজারটি ডিমপাড়া হাঁস রয়েছে। হাঁসের মাংস ও ডিমের চাহিদা বাড়ায় তিনি উদ্যোক্তা হয়েছেন। হাঁস খামার ঘিরে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দেখছেন তিনি। ভবিষ্যতে খামারটি বড় করার ইচ্ছা রয়েছে তার।

সরেজমিনে নগরীর গল্লামারী বাজারে গিয়ে দেখা যায়, শীত শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বিপুলসংখ্যক হাঁসের সমাহার। খুলনাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলা থেকে পাইকাররা পাতি, চীনা ও রাজহাঁস এনেছেন এ বাজারে। এখানে সব ধরনের হাঁস পাওয়া যায় বলে মানুষের ভিড়ও বেশি।

হাঁস বিক্রেতা কামরুল শেখ জানান, খুলনার মধ্যে এ বাজারেই সবচেয়ে বেশি হাঁস পাওয়া যায়। যেকোনো দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাঁস পাওয়া যায় এখানে। খুলনার ডুমুরিয়া, চুকনগর, তেরখাদা, দীঘলিয়া, সাতক্ষীরার  তালার জাতপুর এলাকা থেকে হাঁস আসে এখানে।

কামরুল আরো জানান, শীত শুরু হওয়ায় হাঁস বিক্রিও বেড়েছে। চীনা ও পাতিহাঁসের পাশাপাশি রাজহাঁস কিনছেন অনেকে। চীনা হাঁস ৪০০-৪৫০ টাকা, পাতিহাঁস ৩৫০, দোয়াসলা ৪০০ এবং রাজহাঁস ৪৫০ টাকা প্রতি কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

গল্লামারী কাঁচাবাজারে বাজার করতে আসা নগরীর গোবরচাকা এলাকার বাসিন্দা একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, আমাদের বাবা-দাদাকে দেখেছি শীতে হাঁসের মাংস খেতে। মূলত ঠাণ্ডা আর বাত থেকে রেহাই পেতে অনেক মসলা দিয়ে হাঁস খাওয়া হতো। বেশি খাওয়া হতো হাঁসা, মানে পুরুষ হাঁস। এখন দেখি অনেকটা উৎসবের মতো হয়ে গিয়েছে ব্যাপারটা। মুরগি দেশী না সোনালি তা বোঝা কষ্টকর। কিন্তু হাঁসে এমন ঠকার সম্ভাবনা নেই। যার কারণে শীতে অনেকেই খাদ্য তালিকায় রাখেন হাঁস। খুলনার অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁয় এ সময় স্পেশাল মেন্যুই হচ্ছে হাঁসের মাংস।

নগরীর বয়রা এলাকার বাসিন্দা সৌরভ নামের এক যুবক বলেন, শীত মৌসুমে হাঁসের মাংস খাওয়া একটা রীতির প্রচলন আছে এ অঞ্চলে। এ সময় হাঁসের মাংসের স্বাদই আলাদা। যার কারণে শীত শুরুর সঙ্গে সঙ্গে হাঁস কিনেছি। তিনি বাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা দিয়ে দুটি চীনাহাঁস কিনেছেন। হাঁস রান্না করে বাবার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠাবেন বলেও জানান তিনি।