দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের যাতায়াতের সহজ মাধ্যম রাজবাড়ীর জৌকুড়া ও পাবনা জেলার নাজিরগঞ্জ নৌ-রুট। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঘাটটি সড়ক ও জনপথ বিভাগ তত্ত্বাবধান করছিল। পরে যাত্রী সেবার মান ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতির জন্য ঘাটটি বিআইডব্লিউটিসিকে হস্তান্তর করা হয়, কিন্তু এভাবে কর্তৃপক্ষ পরিবর্তন করা হলেও কাটেনি ভোগান্তি। এখনো ঘাট পরিচালনা নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ।

এ নৌ-রুট দিয়ে প্রতিদিন রাজবাড়ী ছাড়াও ফরিদপুর, মাদারীপুর, পিরোজপুর, বরিশাল, গোপালগঞ্জসহ আশপাশের জেলাগুলোর বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, রংপুর, নাটোরসহ বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করে। চলাচল করে বাস ও ট্রাক ছাড়াও মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেলসহ ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। নৌ-রুটটিতে প্রতিদিন পারাপার হয় অন্তত ৩০-৪০ হাজার মানুষ।

জৌকুড়া-নাজিরগঞ্জ নৌ-রুটে যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধি ও যাতায়াত সহজ করতে গত বছরের নভেম্বরে ঘাটটি বিআইডব্লিউটিসিকে হস্তান্তর করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। বিআইডব্লিউটিসি আবার বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নদীপথ খনন করে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে ঘাটে ফেরি পরিচালনা করছে বিআইডব্লিউটিসি।

বিআইডব্লিউটিসি জৌকুড়া ঘাট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এ নৌ-রুটে পরীক্ষামূলকভাবে ফেরি ক্যামেলিয়া ও কদম চলাচল শুরু করেছে। এর আগে সড়ক ও জনপথ বিভাগ ঘাট পরিচালনা করত। তখন এ নৌ-রুটে ছোট ছোট ফেরি চলাচল করত। আবার রাতে ফেরি চলাচল করার কোনো সুযোগ ছিল না। সব মিলিয়ে নানা কারণে ফেরি চলাচল ব্যাহত হতো। তাতে করে দক্ষিণবঙ্গের মানুষের উত্তরবঙ্গে যাতায়াতের ক্ষেত্রে অন্তত ২০০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে যেতে হতো।

সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, একটি ফেরি ছেড়ে গেলেও আরেক পাশে নোঙর করে রাখা হয়েছে অন্যটি। গাড়ি কমের অজুহাতে এভাবে একটি ফেরি দিয়েই করা হচ্ছে পারাপার। এমনকি ফেরি ছেড়ে যাওয়ার পর ফেরি ঘাটের টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে চলে যান কর্মচারীরা। ফেরি চলাচলের পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও সাধারণ যাত্রী পারাপারে ব্যবহার করা হচ্ছে ট্রলার।

পিকআপ চালক আলীম হোসেন মিয়া বলেন, ‘ঘাটে দুটি ফেরি থাকলেও প্রতিদিন একটি ফেরি চলাচল করে। তবে কখন কখন চলাচল করে তার কোনো সময়সূচি নেই। এ কারণে গাড়ি নিয়ে অনেক পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এ ঘাটে অতিরিক্ত ভাড়া নিলেও তেল কম ব্যবহার হতো, তাই সাশ্রয় হতো, কিন্তু নিয়মিত ফেরি চলাচল না করায় আমাদের ভোগান্তি শেষ হচ্ছে না।’

আরেক মোটরসাইকেল চালক সুমন বলেন, ‘ফেরিতে মোটরসাইকেল পারাপারে ২২০ টাকা করে ভাড়া দিতে হয়। আর ট্রলারে পার করলে ৩০০ টাকা করে নেয়। তবে জনপ্রতি মানুষ পারাপারে লঞ্চ ও ফেরিতে ৭০-১০০ টাকা করে আদায় করা হয়।’

ফেরিতে উঠতে ও নামতে এখনো বেশ সমস্যা হয় জানিয়ে জৌকুড়া ঘাটের ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম আকন্দ বলেন, ‘ঘাট তৈরি হয়নি, সড়ক ভালো না। এ ঘাটটি মানুষের সুবিধার জন্য করলে অবশ্যই সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে। আর নিয়মিত ফেরি চলাচল রাখতে হবে। তা না হলে আগে যে দুর্ভোগ ছিল তা দূর করা যাবে না।’

জৌকুড়া-নাজিরগঞ্জ নৌ-রুটে বিআইডব্লিউটিসির ম্যানেজার মো. মোমিন বলেন, ‘গাড়ি কম থাকার কারণে আপাতত একটি ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। গাড়ির চাপ বাড়লে ফেরি বাড়ানো হবে। ভাড়া বেশি আদায় করা হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।’

প্রয়োজনে ফেরির সংখ্যা বাড়ানো হবে জানিয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) অতিরিক্ত পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন বলেন, ‘নিয়মিত এখানে যানবাহন থাকা সাপেক্ষে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ফেরি চলাচল করবে। তবে যানবাহনের চাপ থাকলে ফেরির সংখ্যা আরো বাড়ানো হবে। এরপর ধীরে ধীরে লঞ্চ সার্ভিসও শুরু করা হতে পারে। নদীর দুই পারেই ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হবে। যাত্রী সেবার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রমও হাতে নেয়া হবে। টার্মিনাল গড়ে তোলা হবে। খুব শিগগিরই নৌ-মন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরি চলাচল কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন।’

এ নৌ-রুটে খননকাজ শেষ হয়েছে জানিয়ে রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী বলেন, ‘আগামীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় গেলে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ও জৌকুড়া- নাজিরগঞ্জ নৌ-রুটে টানেল নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।’