ঢাকা-চট্টগ্রাম মেইন পাওয়ার গ্রিড স্ট্রেনদেনিং প্রকল্পের আওতায় ২১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ (ওভারহেড) মেঘনাঘাট-মদুনাঘাট ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন স্থাপন করছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। কৃষিজমির ওপর সঞ্চালন লাইন স্থাপনের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে ফেনী অংশে চলমান কাজে প্রভাবশালীদের ‘ম্যানেজ’
করে কৃষকদের জমির ক্ষতিপূরণ না দিয়েই সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ দিনের মধ্যে জমির ক্ষতিপূরণ দিয়ে কাজ করার জন্য উচ্চ আদালত নির্দেশনা দেন। কিন্তু তার পরও ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশের বিদ্যুৎ সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির (জাইকা) যৌথ অর্থায়নে ঢাকা-চট্টগ্রাম মেইন পাওয়ার গ্রিড স্ট্রেনদেনিং প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। ৪ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২০ সালেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। কাজটি বাস্তবায়ন করছে ভারতের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কেইসি ইন্টারন্যাশনাল। এ প্রকল্পের আওতায় ২১৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য মেঘনাঘাট-মদুনাঘাট ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা হচ্ছে। সঞ্চালন লাইনটি ফেনী সদর ও ছাগলনাইয়া উপজেলা হয়ে ফেনী জেলা অতিক্রম করবে। ফেনীতে গত জানুয়ারিতে কৃষিজমির ওপর প্রকল্পের সঞ্চালন লাইন স্থাপনের কাজ শুরু হয়।
ফেনীর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, প্রকল্পের সঞ্চালন লাইন স্থাপন নিয়ে বিদ্যুৎ আইনের ৬, ১৩ ও ৬০ ধারা এবং ১৯৮৫ সালের টেলিগ্রাফ আইনের ১০-১৯ ধারা ক্ষমতা বলে ফেনীর জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজ্জামান ২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর একটি গণবিজ্ঞপ্তি প্রচার করেন। ওই বিজ্ঞপ্তিতে তিনি প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত ফসল, গৃহ ও বৃক্ষের ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে বলে ঘোষণা দেন। তবে প্রকল্পে টাওয়ার নির্মাণের জন্য জমির ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না বলে প্রচার করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১ জুলাই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষাণী ফেরদৌস আরা বেগম ও ২ জুলাই মো. গোলাম জিলানী গণবিজ্ঞপ্তি বাতিল করে কৃষকদের ক্ষতি নিরূপণ করে নোটিস প্রদানের দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন জমা দেন। ওই আবেদনে বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪২ ও বিদ্যুৎ আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পরিশোধ এবং ভূমি অধিগ্রহণ করে কৃষকদের পাওনা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সঞ্চালন লাইন স্থাপনকাজ বন্ধ রাখতে অনুরোধ জানানো হয়। সমাধানের আশ্বাস না পেয়ে ১৯ জুলাই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন কৃষকরা। ২২ জুন এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক জমির ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবকে চিঠি দেন। ওই চিঠিতে জেলা প্রশাসক উল্লেখ করেন, প্রকল্পের লোকজন গণবিজ্ঞপ্তি প্রচারের জন্য একটি নমুনা তাকে প্রদান করেন। ওই নমুনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জমির ক্ষতিপূরণ ব্যতীত শুধু ফসল, বৃক্ষ ও গৃহের ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়ে উল্লেখ আছে। কিন্তু বিদ্যুৎ আইন ২০১৮ এর ১২ ধারায় জমির ক্ষতিপূর্যেণর কথা উল্লেখ থাকলেও তা প্রচার করা হয়নি। ১২ ধারা উল্লেখ না করে গণবিজ্ঞপ্তি প্রচারের পর তিনি বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন।
একপর্যায়ে নয়জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক উচ্চ আদালতে ক্ষতিপূরণ দাবি করে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। ২২ জুলাই বিচারপতি এম এনায়েতুর রহিম ৩০ দিনের মধ্যে আইনগতভাবে সমাধান করতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা প্রদান করেন। নির্দেশ হাতে পেয়ে ২৩ জুলাই পুনরায় জেলা প্রশাসক কৃষকদের জমির ক্ষতিপূরণ দানের ব্যবস্থা করতে বিদ্যুৎ সচিবকে আরো একটি চিঠি দেন। কোনো সুরাহা না পেয়ে ১৯ জুলাই কৃষকরা পুনরায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন। ২৫ আগস্ট জেলা প্রশাসক উচ্চ আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন ও কৃষকদের ক্ষতিপূরণপ্রাপ্তির আবেদনগুলো নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রকল্প পরিচালককে একটি চিঠি দেন। এতেও সুফল না পেয়ে কৃষকরা ৯ ডিসেম্বর ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখতে একটি মামলা দায়ের করেন।
জাহানপুরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আবদুস শাকুর জানান, বিদ্যুৎ আইন অমান্য করে ও উচ্চ আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না করে ঠিকাদার আমাদের ফসলি জমি ধ্বংস করে দিচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করায় ভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা কাজের স্থানে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। আমাদের জমিতে কাজের ছবি তুলতে চাইলে ঠিকাদারের সহযোগী আমাকে মারধর করে।
ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী ইউনিয়নের জাহানপুর গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় পাঁচ শতক জমির মাটি তুলে গর্ত করে সেখানে সঞ্চালন লাইন স্থাপনের জন্য বেজমেন্ট ঢালাইয়ের কাজ করছেন কয়েকজন শ্রমিক। এখানে ১০০ বর্গফুটের চারটি বেজমেন্ট ঢালাইয়ের কাজ চলছে। ঢালাই শেষে ওই বেজমেন্ট থেকে অ্যাঙ্গেলের ওপর বসানো হবে সঞ্চালন লাইনের টাওয়ার।
মেসার্স ইস্টার্ন পাওয়ারের ঠিকাদার সাজ্জাদ হোসেনের প্রধান সহযোগী মামুনুর রহমান জানান, প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ২ হাজার টাকা হারে গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। আমরা টাওয়ার স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করছি। অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ দেয়ার দায়িত্ব সরকারের।
এ বিষয়ে ফেনী জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, আইন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক জমির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা রয়েছে। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বিদ্যুৎ সচিব ও প্রকল্প পরিচালককে কয়েকবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্দেশনা পেলে কৃষকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।










