পদ্মা সেতু মুন্সিগঞ্জের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জ এখন সরাসরি রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত, যা যাতায়াতের সময় ও খরচ কমিয়েছে এবং নদীপথের ওপর নির্ভরশীলতাও কমিয়েছে। সেতুকে কেন্দ্র করে পদ্মাপারে পর্যটনের প্রসার ঘটছে। তবে পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও অব্যবস্থাপনার কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন পর্যটকরা।
পর্যটকরা বলছেন, পর্যাপ্ত যাত্রী ছাউনি, গাড়ি পার্কিং সুবিধা ও পরিচ্ছন্ন স্যানিটেশন না থাকায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে পদ্মাপাড়ে আসা পর্যটকদের। পর্যটন সম্ভাবনা ধরে রাখতে সময়োপযোগী উদ্যোগ নেয়ার তাগিদও দিয়েছেন তারা।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ২২ জুন পদ্মাপারে পর্যটন হাব ও আন্তর্জাতিক কনটেইনার পোর্ট নির্মাণের লক্ষ্যে মুন্সিগঞ্জে পাঁচ উপদেষ্টার যৌথ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই সভায় ৭৫৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৯ দশমিক ১৩ একর জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত উদ্যোগ নেয়ার কথা জানানো হয়েছিল। এতে সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি দেশ ও দেশের বাইরের বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন নৌ-পরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। পাশাপাশি পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দিয়ে শিমুলিয়া ঘাটে জেটি স্থাপন ও সার্বক্ষণিক একটি ফেরি চলাচলের ব্যবস্থা রাখার কথাও জানানো হয়েছিল। পদ্মা সেতু ঘিরে পর্যটন হাব তৈরি করা এবং ইকো পোর্ট গড়ে তোলাসহ ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়নে মাস্টারপ্ল্যান তুলে ধরা হয়েছিল গণমাধ্যমে। তবে বছর ঘুরে নতুন বছর এলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে তাগিদ দেয়ার কথা জানিয়েছেন মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পদ্মাপাড়ে পর্যটন সম্ভাবনাময় অবস্থান ধরে রাখতে সময়োপযোগী উদ্যোগ নেয়ার বিকল্প নেই।’
শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাওয়া প্রান্তে গড়ে উঠেছে দুই শতাধিক ছোট-বড় খাবার হোটেল। এছাড়া রয়েছে প্রমোদতরীতে ইলিশ ভোজনের ব্যবস্থা। পাশাপাশি পদ্মার তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বেশকিছু ভাসমান হোটেল। যেখানে আনাগোনা বেড়েছে পর্যটকদের।
তবে অভিযোগ রয়েছে, ইঞ্জিনচালিত ট্রলার কিংবা প্রমোদতরীতে পর্যটকদের জন্য নেই লাইভ জ্যাকেট। অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় পর্যটকদের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা দেয়ার ব্যবস্থাও নেই। পর্যটন ও যাত্রীদের সচেতনতা বাড়াতে ট্যুরিস্ট ও নৌ-পুলিশের তেমন কোনো তৎপরতাও দেখা যায়নি শিমুলিয়া ঘাট এলাকায়।
পর্যটকদের অভিযোগ, তদারকি না থাকায় নৌযানগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। অবশ্য এমন অভিযোগ স্বীকার না করলেও ঘাট এলাকায় বড় একটি সিন্ডিকেট চক্রের নিয়ন্ত্রণে এমন কর্মকাণ্ড চলছে বলে দাবি করেছেন ইঞ্জিনচালিত ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি সিদ্দিক মণ্ডল।
ঘাট এলাকায় দেখা গেছে, ৭০০-১০০০ টাকায় ঘণ্টাভিত্তিক চুক্তিতে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ভাড়া করে নদীতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মাওয়া প্রান্তে আসা দর্শনার্থীরা। পাশাপাশি বিভিন্ন ট্রলারে জনপ্রতি ৫০-১০০ টাকা দিয়েও পদ্মা ভ্রমণে অংশ নিচ্ছেন অনেকে। এছাড়া স্পিডবোটে ঘুরতে জনপ্রতি নেয়া হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকা।
রাজধানীর গুলশান থেকে স্ত্রী ও দুই মেয়ে মাওয়ায় বেড়াতে এসেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুর রব দেওয়ান। তিনি বলেন, ‘একটু প্রশান্তির জন্য পদ্মাপাড়ে ঘুরতে এসেছি। তবে এখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তেমন কোনো তদারকি নেই পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য। পাশাপাশি ইঞ্জিনচালিত ট্রলারগুলো যেভাবে পারছেন খেয়ালখুশিমতো ভাড়া আদায় করছে।’
জার্মানিতে থাকেন রকি জ্যাকসন। ছুটিতে দেশে এসেছেন। তিনিও ঘুরতে এসেছেন পদ্মাপাড়ে। প্রবাসী এই যুবক বলেন, ‘বহির্বিশ্বের সৌন্দর্যের চেয়েও পদ্মাপাড়ের সৌন্দর্য বিমোহিত করেছে আমাকে। দেশে ফেরার আগেই ভেবে রেখেছিলাম পদ্মাপাড়ে যাব। পদ্মা সেতু দেখব, তাজা ইলিশের স্বাদ নেব। ইচ্ছাটা পূরণ হয়েছে। তবে এখানকার কিছু বিষয়ে অব্যবস্থাপনা রয়েছে।’
পদ্মাপােড় ঘুরতে আসা দম্পতি রহিমা আফরোজ ও প্রান্ত শেখের গল্পটা একটু ভিন্ন। সূর্যাস্তের সঙ্গে নিজেদের সুন্দর মুহূর্তের ছবি মুঠোফোনে ধারণ করেছেন এ নবদম্পতি। তাদের দাবি, ঘাট এলাকায় যাত্রী ছাউনি কিংবা পরিচ্ছন্ন স্যানিটেশন না থাকায় ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে তাদের।
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের দাবি, উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশে নদী বাঁচাতে যুগোপযোগী উদ্যোগ না নিলে হুমকিতে পড়তে পারে জীববৈচিত্র্য ও নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবিকা।










