সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যা বেড়েছে। বনের খাল বা নদীর ধারে দলবেঁধে হরিণের চলাফেরার দৃশ্য এখন হরহামেশা চোখে পড়ে। খুলনা অঞ্চলের প্রধান বন সংরক্ষক মিহির কুমার বলেন, কয়েক বছরে বনের জীববৈচিত্র্যে পরিবর্তন এসেছে। এখন সুন্দরবনে গেলেই হরিণ দেখা যাচ্ছে, যা আগে ছিল না। হরিণের সঙ্গে বাঘও দেখতে পাচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
হরিণ শিকার আগের তুলনায় অনেকাংশে কমেছে দাবি করে তিনি বলেন, র্যাব, কোস্টগার্ড, বিজিবি ও বন বিভাগের নিয়মিত টহলের কারণে বনে এখন শিকারের সুযোগ কম।
কিন্তু খুলনার সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে বাঘ হত্যা কিছুটা কমলেও একেবারে তা বন্ধ হয়নি। আর বাঘের প্রধান খাবার হরিণ শিকার হচ্ছে প্রায়ই। একই কথা বলছেন সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে আটক হরিণ শিকারিদের তথ্যে দেখা গেছে, বনের পাশে যাদের বাড়ি, তারাই বেশি হরিণ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা উপজেলা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা এবং বাগেরহাটের মোংলা ও শরণখোলার মানুষ বেশি হরিণ শিকার করে।
সর্বশেষ শুক্রবার রাত ৮টার দিকে খুলনার দাকোপ উপজেলার কালাবগী এলাকা থেকে হরিণের একটি মাথা, চামড়া, পা ও ২১ কেজি মাংসসহ ফারুক হোসেন (৩৫) নামে এক শিকারিকে আটক করা হয়েছে বলে জানান কোস্টগার্ডের জোনাল কমান্ডার লে. এম মামুনুর রহমান। ফারুক দাকোপের নলিয়ানের মৃত কাওছার গাজীর ছেলে।
দীর্ঘ দুই যুগেরও অধিক সময় সুন্দরবনে মাছধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন খুলনার দাকোপ উপজেলার ঢাংমারীর সীতেশ বাওয়ালি। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বনে হরিণের সংখ্যা বেড়েছে। বাঘের দেখাও মিলছে আগের চেয়ে বেশি। ক্রমেই চোরা শিকারির সংখ্যা বাড়ছে।
এজন্য বনের পাশের মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থাকে দায়ী করে তিনি বলেন, সুন্দরবন লাগোয়া জনপদের দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের জীবন-জীবিকা চলে সুন্দরবনের মাছ ধরে। আগে সুন্দরবনে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন লবণাক্ততার কারণে সে অবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। লবণাক্ততার কারণে গরান বন বাড়ছে না। ঘর নির্মাণে ঢেউটিনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় গোলপাতার চাহিদাও কমেছে। তাছাড়া বন বিভাগ রাজস্ব বাড়ানোয় বিপাকে পড়তে হচ্ছে তাদের। এসব কারণে অনেকেই চোরা শিকারের পথ অনুসরণ করছে।
সুন্দরবনে কাজ করতে গিয়ে অনেক চোরা শিকারির মুখোমুখিও হয়েছেন তিনি। ওইসব শিকারি তাকে জানিয়েছেন, ‘গডফাদার মহাজন’-এর কাছ থেকে অগ্রিম দাদন নিয়ে ছদ্মবেশে বনে ঢোকেন তারা। তারপর সুযোগ বুঝে খাদ্যে বিষ অথবা ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে, ফাঁদ ও বন্দুক দিয়ে গুলি করে হরিণ শিকার করা হয়। পরে স্থানীয় পদ্ধতিতে মাংস, চামড়া, মাথাসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে পাচার করে তারা।
সীতেশ জানান, সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জসংলগ্ন গ্রামগুলোয় দেড় শতাধিক শিকারি দল রয়েছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাসের মোহসিন হোসেন বলেন, সুন্দরবনে মূলত হরিণ শিকার করত দস্যুরা। কিন্তু সুন্দরবন এখন দস্যুমুক্ত হওয়ায় হরিণ শিকারও কমেছে। এখন সুন্দরবনে গেলেই হরিণ দেখা যাচ্ছে। হরিণের সঙ্গে বাঘও দেখতে পাচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
বিভাগীয় এ বন কর্মকর্তা বলেন, শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ায় এখন মাংসসহ হরিণ শিকারি ধরা পড়ছে। এক বছরে সুন্দরবনের আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১০ হরিণ শিকারিকে মাংসসহ আটক করা হয়েছে। হরিণের সংখ্যা বাড়ার আরেকটি কারণ হিসেবে মোহসিন বলেন, সুন্দরবনে রাসমেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হরিণ শিকার কমেছে। বছরের শেষের দিকে সুন্দরবনের দুবলারচরে অনুষ্ঠিত রাসমেলা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ সেখানে আসত। অল্প লোকবল দিয়ে এত মানুষের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব হতো না। এ কারণে ওই সময় বিপুল পরিমাণ হরিণ শিকার করা হতো। তিন বছরে বন বিভাগ এ মেলার ব্যাপ্তি কমিয়েছে। এখন শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই রাসমেলায় যেতে পারেন। ফলে সহজেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।










