যুক্তরাজ্য সফররত প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আজ বৈঠকে বসছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। স্থানীয় সময় আজ সকাল ৯টায় লন্ডনের পার্ক লেনে হোটেল ডোরচেস্টারে এ বৈঠক হবে। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ বৈঠককে টার্নিং পয়েন্ট বলে মনে করছেন বিএনপি নেতারা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবশ্য এটিকে দেখছেন দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট কাটানোর উদ্যোগ। সে হিসেবে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্ব পাবে জাতীয় নির্বাচনের সময় পুনর্নির্ধারণ। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার, বিচার, জুলাই সনদসহ নানা বিষয়ও স্থান পেতে পারে। ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের রুদ্ধদ্বার এ বৈঠকের মধ্য দিয়ে সব দ্বিধা-দ্বন্দ্বেরও অবসান হতে পারে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ইশরাক হোসেনের মেয়র পদ, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ইস্যুতে সরকার ও বিএনপির টানাপড়েনের মধ্যেই আগামী বছরের এপ্রিলে নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণায় বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায় দলটি। যে কারণে ঈদের পর আন্দোলনের জন্য অনেকটা মানসিকভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল বিএনপি। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই প্রধান উপদেষ্টার লন্ডন সফরের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা ও তারেক রহমানের বৈঠকের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

বিএনপির একটি সূত্র জানায়, ড. ইউনূসের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন কিনা সে বিষয়ে স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক ডেকে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতামত নেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কয়েকজন নেতা শুরুতে বৈঠকে অংশ নেয়ার বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করলেও দীর্ঘ আলোচনার পর সবাই ইতিবাচক সিদ্ধান্তে আসেন। সেই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচনের চূড়ান্ত রূপরেখা চাওয়ার পরামর্শ দেন দলটির নেতারা।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা চাই নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হোক। কারণ এ সময়টায় স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকে। কিন্তু মার্চ বা এপ্রিলে নির্বাচন আয়োজন করতে গেলে কিছু সমস্যা তৈরি হবে। যেমন ধরেন, মার্চে স্কুল-কলেজে পরীক্ষা হয়। এপ্রিলে আবার রোজা। রোজার মধ্যে নির্বাচনের বিষয়টা আমাদের দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। এসব বিষয়ে আমাদের অবস্থানটি বৈঠকে তুলে ধরা হবে।’

সব রাগ-অনুরাগের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের কল্যাণে অন্তর্বর্তী সরকার কাজ করবে—এমন প্রত্যাশা রেখে বিএনপির এ নেতা আরো বলেন, ‘বিগত সময় দেশের মানুষ অনেক চড়াই-উতরাই দেখেছে। মানুষের মাঝে তাই এক ধরনের বিশ্বাসহীনতা তৈরি হয়েছে। আমরা মনে করি এ বৈঠকের মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হবে। মানুষের মনের অবিশ্বাস দূর করার দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের।’

বৈঠকের জন্য ২ ঘণ্টা সময় রাখা হয়েছে, যাতে দেশের চলমান বিভিন্ন সংকটের সমাধান খোঁজা যায়। বিশেষ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন, পতিত সরকারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার বিচার, গণতন্ত্র উত্তরণসহ বেশকিছু বিষয় গুরুত্ব পাবে বলে মনে করা হচ্ছে বিএনপির পক্ষ থেকে। বৈঠকটি ওয়ান টু ওয়ান হওয়ায় এখানে দলের অন্য কোনো নেতা যোগ দিচ্ছেন না। যদিও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে লন্ডনে ডেকে নিয়েছেন তারেক রহমান।

দলীয় কার্যালয়ে গতকাল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, ড. ইউনূসের সঙ্গে তারেক রহমানের যে বৈঠক হতে যাচ্ছে সেখানে বেশকিছু বিষয় উঠে আসবে। নির্বাচন, সংস্কার ও গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও এ বৈঠকটিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাদের মতে, রাজনীতিতে সবাই মুখে নীতিকথা বললেও আড়ালে ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ ঠিকঠাক চলে। ফলে এ মুহূর্তে বিএনপি বড় দল হলেও গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনমুখী অনেক দলই ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করছে।

নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৈঠকটি নিয়ে আমরা আশাবাদী। রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবেই। সেগুলো আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধান করতে হবে। রাজপথে কোনো সমস্যার সমাধান হয় না। আমরা অতীতে দেখেছি বিভিন্ন সমস্যা রাজপথে সমাধান করতে গিয়ে সহিংসতার সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি আর চাই না। আমরা চাই আলোচনার মধ্য দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হোক। এ বৈঠকের মধ্য দিয়ে দ্রুততম সময়ে নির্বাচনের একটি প্রক্রিয়া শুরু হোক।’ আর এ সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটা পথ তৈরি হোক, সেটাই দেশবাসী প্রত্যাশা করে বলে মনে করেন এ রাজনৈতিক বিশ্লেষক।