স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা ২০২৬ সাল বহাল রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত এবং চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কেবল একটি নির্বাচিত সরকারই নিতে পারে। তিনি স্পষ্ট করেছেন, এই বিতর্ক উত্তরণের বিরুদ্ধে নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈধতা নিয়ে।

তারেক রহমান সোমবার রাতে তার ভ্যারিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেয়া দীর্ঘ পোস্টে বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

তিনি লিখেছেন, ‘গাজীপুরের ছোট একটি গার্মেন্টস কারখানার মালিকের কথা কল্পনা করুন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি তার ব্যবসা গড়ে তুলেছেন, শত শত শ্রমিককে কর্মসংস্থান দিয়েছেন, সামান্য মুনাফায় ব্যবসা সামলেছেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেছেন। যে শুল্ক সুবিধা তার দামকে প্রতিযোগিতামূলক রেখেছিল, একদিন, কোনো দৃশ্যমান ঘোষণা ছাড়াই তা উধাও হয়ে গেল। এতে কমতে শুরু করে তার অর্ডার। কারখানা খোলা রাখা, কর্মীদের বেতন দেয়া ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার চাপও বেড়ে যায় তার ওপর।

এবার নারায়ণগঞ্জের স্নাতক একজন তরুণীর কথা কল্পনা করুন। তার বাবা একটি কারখানায় কাজ করেন। অতিরিক্ত আয়ের জন্য তাকে ওভারটাইম করতে হয়। রফতানির ওপর চাপ বাড়লে প্রথমে বন্ধ হয় তার ওভারটাইম। এরপর শিফট কমে আসে। তারপর চাকরি যায়। এগুলো কোনো শিরোনাম নয়। এগুলো সাধারণ মানুষের ঘরের ভেতরের নীরব সংকট।

এই মানুষগুলো এসব সিদ্ধান্তের ওপর কখনো ভোট দেননি। তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়নি, এমনকি প্রকৃত সংখ্যাগুলোও দেখানো হয়নি। এ কারণেই বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের বিতর্কটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিএনপি আগেও বলেছে যে, স্থগিত বা পেছানোর বিকল্পটি উন্মুক্ত না রেখে ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, যা একটি নির্বাচনী ম্যান্ডেটবিহীন অন্তর্বর্তী সরকার নিচ্ছে। অথচ এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতকে কয়েক দশক ধরে প্রভাবিত করবে।

আমাদের বলা হচ্ছে যে স্থগিত করা ‘অসম্ভব’, এমন অনুরোধ করাই নাকি ‘অপমান’, এবং জাতিসংঘ তা নাকি বিবেচনাও করবে না। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা।

অ্যাঙ্গোলা এবং সামোয়ার মতো দেশগুলোর উত্তরণের সময়সূচি সামঞ্জস্য করা হয়েছে। দেশগুলো যখন অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হয়, তখন জাতিসংঘের নিয়মাবলীতেই নমনীয়তার সুযোগ রাখা আছে। তাই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী সিদ্ধান্তে সময় চাওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীল আচরণ হওয়া উচিত।

কিন্তু আমরা কেন এমন ভান করছি যে কোনো বিকল্প নেই? কেন আমরা নিজেদের ভবিষ্যৎকে সংকুচিত করছি? স্থগিতের বিকল্পটি প্রকাশ্যে বাতিল করে আমরা আমাদের নিজেদের দর কষাকষির ক্ষমতাই দুর্বল করছি। আলোচনার টেবিলে বসার আগেই নিজেদের কৌশল প্রকাশ করে ফেলছে।

সরকারি নথিতেও ব্যবসায়ী মহলের চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ঋণঝুঁকি বৃদ্ধি ও রফতানি কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে—যা এলডিসি পরবর্তী চাপের ইঙ্গিত দেয়।

এটি এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের বিরোধিতা নয়। বাংলাদেশ এই এগিয়ে যাওয়ার অধিকার অর্জন করেছে। কিন্তু গ্র্যাজুয়েশনের অধিকার থাকা আর গ্র্যাজুয়েশনের জন্য প্রস্তুত থাকা— দুটো বিষয় এক নয়।

আমি মনে করি, প্রকৃত জাতীয় শক্তি হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণে সন্দেহ না থাকা নয়, বরং অপরিবর্তনীয় কোনোকিছু হয়ে ওঠার আগেই কঠিন প্রশ্ন করার শৃঙ্খলা বজায় রাখাই প্রকৃত জাতীয় শক্তি।

এবার চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে তাকান। এটা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবেশদ্বার। সেখানে যা ঘটে তার গভীর প্রভাব পড়ে লাখো মানুষের জীবনে। বন্দরের বিষয়ে সাম্প্রতিক দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তগুলো কোনো রুটিন কাজ নয়। এগুলো জাতীয় কৌশলগত সম্পদ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি— যা অন্তর্বর্তী সরকার নেয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকল্পকে সীমিত করছে। এখানে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের মতোই কৌশলগত বিকল্প সংকুচিত করা হচ্ছে, জনআলোচনা অবাঞ্ছিত হিসেবে দেখা হচ্ছে, আর যৌক্তিক উদ্বেগগুলোলে অনিবার্যতার নামে উপেক্ষা করা হচ্ছে।

একটা বিষয় স্পষ্ট করে বলি—এটা কোনো ব্যক্তিকে আক্রমণ নয়। এটি প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করা এবং এই নীতি রক্ষা করার বিষয় যে, জাতীয় জীবনের কয়েক দশক ধরে প্রভাবিত করবে এমন সিদ্ধান্তগুলো জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকারের নেয়া উচিত।

এলডিসি স্ট্যাটাস থেকে আমাদের উত্তরণ বা বন্দরের সংস্কার করা উচিত নয়, এমন কথা কেউ বলছেন না। যুক্তিটি আরো সহজ ও মৌলিক— একটি জাতির ভবিষ্যত এমন একটি সরকার দ্বারা স্থির করা উচিত নয়, যাকে জাতি নির্বাচিত করেনি।

কৌশলগত ধৈর্য দুর্বলতা নয়। জনপরামর্শ কোনো বাধা নয়। গণতান্ত্রিক বৈধতা বিলম্ব নয়। আমার মতে, এটাই হয়তো এসবের পেছনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্য।

বাংলাদেশের মানুষ কখনোই ভবিষ্যৎ নিয়ে নীরব ছিল না। তারা সম্মান, অধিকার ও অংশগ্রহণে বিশ্বাস করে। তাই ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষের কথা বলার, পছন্দ করার এবং একটি সহজ সত্যকে পুনরায় নিশ্চিত করার একটি সুযোগ যে, এই দেশের ভবিষ্যৎ অবশ্যই এই দেশের মানুষের দ্বারাই তৈরি হতে হবে, ‘’সবার আগে বাংলাদেশ’’এই বিশ্বাস নিয়ে।‘