মেহেরপুরে গমের হুইট ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে বারি-৩০ ও ৩৩ জাতের গম। এ দুই জাতের গম আবাদ করে জেলার কৃষকরা দীর্ঘ পাঁচ বছর পর লাভের মুখ দেখার প্রত্যাশা করছেন।
হুইট ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাবে ২০১৬ সালে গম চাষে লোকসানের মুখে পড়েন মেহেরপুর জেলাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের আটটি জেলার কৃষক। ফলে এ অঞ্চলে গম আবাদে আগ্রহ কমতে থাকে। ওই বছরের পর গম চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা হতো কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে। কিন্তু গত বছরে পরীক্ষামূলকভাবে বারি-৩০ ও ৩৩ জাতের গম আবাদ করে লাভবান হন কৃষকরা। তারই ধারাবাহিকতায় চলতি মৌসুমে কৃষি অফিসের সহযোগিতায় এ দুই জাতের গম চাষে কৃষকদের আগ্রহী করতে নানা প্রচারণা চালানো হয়। গত বছর ব্লাস্টের আক্রমণ কিছুটা থাকলেও চলতি মৌসুমে তা একেবারেই নেই। ফলে এবার জেলার কৃষকরা ব্লাস্টমুক্ত গম ঘরে তুলছে। উচ্চফলন ও বাজার মূল্য ভালো থাকায় লাভের প্রত্যাশা করছেন কৃষরা।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে মেহেরপুর সদর, গাংনী ও মুজিবনগর উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১১ হাজার ৩৬৫ হেক্টর জমিতে গম চাষ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি গমের চাষ হয়েছে গাংনী উপজেলায়।
গত বছর ১১ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছিল। ওই সময় গমে ব্লাস্ট রোগ হবে না বলে আশা করেছিলেন কৃষক। কিন্তু ব্লাস্ট রোগের পাশাপাশি বাড়তি পাতার মরিচা ও হেড ব্লাইট রোগের প্রাদুর্ভাবও দেখা দিয়েছিল। ফলে কৃষকরা বিপাকে পড়েন। কিন্তু চলতি মৌসুমে ভালো আবহাওয়া, রোগ বালাই কম ও ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী জাত বারি-৩০ ও ৩৩ জাতের গম আবাদ বেশি হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।
বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, বরিশাল ও ভোলা জেলায় প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তবে রোগটি প্রথম শনাক্ত হয় মেহেরপুরে। এ রোগের কারণে গমের ফলন শতকরা ৪০-৬০ ভাগ কমে যায় এবং ক্ষেত্র বিশেষ কোনো কোনো ক্ষেতের ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কুলবাড়িয়া গ্রামের কৃষক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে চার বিঘা জমিতে গম আবাদ করেছি। এর মধ্যে এক বিঘা জমিতে বারি-৩৩ ও বাকি জমিতে বারি-৩০ জাতের গম আবাদ করেছি। এসব জাতের গমে কোনো প্রকার রোগবালাই দেখা দেয়নি। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর আমি লাভের মুখ দেখব।
মেহেরপুর সদর উপজেলার পিরোজপুর গ্রামের গমচাষী সুমন ইসলাম বলেন, দুই বছর লোকসানের কারণে গমের আবাদ ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু চলতি মৌসুমে কৃষি বিভাগের আশ্বাসে আবারো দুই বিঘা জমিতে গম চাষ করি। এতে বেশ ভালো ফলন হয়েছে। বিঘাপ্রতি ১৬-১৭ মণ করে গমের ফলন হয়েছে।
গাংনী উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা কেএম সাহাব উদ্দীন জানান, গাংনী উপজেলায় ১৭-১৮ সালের দিকে গমের আবাদ শূন্যের কোটায় চলে যায়। সে পরিস্থিতি থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। গত বছর গম চাষে আমরা কৃষকদের উৎসাহিত করা শুরু করি। বারি-৩৩ ও ৩০ জাতের গম চাষে আগ্রহী করার চেষ্টা করা হলেও অনেকে সঠিক সময়ে বপন না করা, মরিচা পড়া ও হুইট ব্লাস্টের আক্রমণ দেখা দিয়েছিল। সব মিলিয়ে গমচাষীদের জন্য পাঁচটি বছর ভালো যায়নি। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। চলতি মৌসুমে গাংনী উপজেলায় ৬ হাজার ৩২০ হেক্টর গম চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে বারি-৩৩ ও বারি-৩০ জাতের গম চাষ করেছে কৃষক। ফলে গমের ফলন অনেক ভালো হয়েছে। দামও ভালো পাচ্ছেন চাষীরা। বর্তমান গমের বাজার মূল্য চলছে ৯২০ থেকে ১ হাজার টাকা মণ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক স্বপন কুমার খাঁ জানান, মেহেরপুরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), বাংলাদেশ
পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ও মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) যৌথভাবে গমের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধে ২০১৮ সাল থেকে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, এটি এখনো চলমান। তাছাড়া ব্লাস্ট প্রতিরোধী জাত বারি-৩৩ ও বারি-৩০ জাতের বীজ কৃষকদের মাঝে সরবরাহ করা হচ্ছে। কৃষি বিভাগ থেকে মাঠ পর্যায়ে প্রতিনিয়ত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।










