দেড় যুগের বেশি সময় ধরে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। হাসপাতালে ভর্তি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেয়ার মতো পরিস্থিতি কিনা, তা পর্যবেক্ষণের পর তার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বিএনপির অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে গতকাল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেয়ার মতো শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের পর তারেক রহমান দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেবেন। পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে শিগগিরই দেশে ফিরবেন তিনি।’

এদিকে তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়ে সরকারের কাছে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন গতকাল জানান, তারেক রহমান এখনো ট্রাভেল পাস চাননি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকের এক প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, ‘ট্রাভেল পাস উনি চাইলে ইস্যু হবে।’

তখন সাংবাদিক জানতে চান—এখনো চাননি? জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘আমার জানা মতে এখনো চাননি।’

তারেক রহমানের কোনো পাসপোর্ট আছে কিনা এমন প্রশ্নে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘এটা বলতে পারব না আমি।’ আরেক প্রশ্নে তিনি জানান, তারেক রহমানের ফেরার বিষয়ে ‘সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য’ তার কাছে নেই।

চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘ওটার প্রস্তুতি আছে, যদি প্রয়োজন (হয়), ডাক্তাররা বললে তো নিয়ে যাওয়া হবে।’

তাকে বিদেশ যাওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হতে কত সময় লাগতে পারে, এমন প্রশ্নে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘এটা তো আমরা কনফার্ম হব না। এটা উনার আত্মীয়স্বজন আর পার্টির লোকজন কনফার্ম করবেন যে বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে। অ্যারেঞ্জমেন্ট আছে।’

এদিকে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সভাকক্ষে গতকাল আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমানের দেশে ফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা শঙ্কা এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সবার জন্যই প্রস্তুত আছে। কারো যদি বিশেষ নিরাপত্তার প্রয়োজন হয়, সেটি দেয়ার জন্যও মন্ত্রণালয় প্রস্তুত আছে।’

আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কবে দেশে ফিরবেন, সেই আলোচনা এখন তুঙ্গে। এর আগে বিএনপি নেতারা বলেছিলেন, নভেম্বরে তিনি দেশে ফিরবেন। এদিকে গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া হাসপাতালে ভর্তি হলে তারেক রহমানের দেশে ফেরার আলোচনা জোরালো হয়।

গত ২৩ নভেম্বর রাতে বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, তার ফুসফুসে ইনফেকশন হয়েছে। ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন থেকে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন। তাকে হাসপাতালে ভর্তির চারদিন পর গত বৃহস্পতিবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা ‘সংকটময়’। পরের দিন শুক্রবার তিনি বলেন, ‘উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নেয়ার মতো শারীরিক অবস্থা নেই খালেদা জিয়ার।’

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার এমন অবস্থার মধ্যে গত শনিবার এক ফেসবুক পোস্টে নিজের দেশে ফেরার বিষয়ে কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশে ফেরার বিষয়টি তার ‘একক নিয়ন্ত্রণাধীন’ নয়। তার এমন বক্তব্যের পর সরকারের তরফ থেকে বলা হয়, তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে কোনো আপত্তি নেই। তিনি দেশে ফিরতে চাইলে সহযোগিতার আশ্বাসও আসে একাধিক উপদেষ্টার কণ্ঠে।

এর মধ্যে সোমবার রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারেক রহমানের ঢাকার পথে রওনা নিয়ে আলোচনা হতে থাকে। গত রোববার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছিলেন, তারেক রহমান দেশে ফিরতে চাইলে একদিনের মধ্যেই তাকে ‘ওয়ান টাইম পাস’ দিতে পারবে সরকার। ওইদিন এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটার নিয়ম হচ্ছে যে যখন পাসপোর্ট থাকে না বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে বলে, তখন কেউ যদি আসতে চান, তাহলে তাকে আমরা ওয়ান টাইম পাস একটা দিয়ে দিই, একবার দেশে আসার জন্য। তো এটাতে একদিন লাগে। কাজেই এটা উনি যদি আজকে বলেন যে উনি আসবেন, আগামীকাল হয়তো আমরা এটা দিলে পরশুদিন প্লেনে উঠতে পারবেন। কোনো অসুবিধা নেই। এটা আমরা দিতে পারব।’

এদিকে খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য যেভাবে সবাই সহযোগিতা এবং শুভকামনা জানাচ্ছেন তার জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তারেক রহমান। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে গতকাল দেয়া এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য যেভাবে সহযোগিতা ও শুভকামনা জানানো হচ্ছে, জিয়া পরিবার ও বিএনপির পক্ষ থেকে আমরা সবার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। বিভিন্ন দেশের নেতারা, কূটনীতিকরা ও বন্ধুদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের অপরিসীম ভালোবাসা ও দোয়া, সবকিছু আমাদের আবেগ ও অনুভূতিকে গভীরভাবে স্পর্শ করছে।’