নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা বাইতুল সালাত জামে মসজিদের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তিতাস গ্যাসের লিকেজ থেকে গ্যাস নির্গত হয়ে মসজিদের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বিদ্যুতের লাইনে স্পার্ক থেকে আগুনের সূত্রপাত এবং বিস্ফোরণ ঘটে। 

জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্যই জানানো হয়েছে। এ নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সামনে তদন্তের বিস্তারিত তুলে ধরেছেন তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক খাদিজা তাহেরা ববি।

তদন্ত কমিটির প্রধান মসজিদ নির্মাণে ক্রুটি, মসজিদের সরঞ্জামাদি রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা, রাজউক ও মসজিদের সামনের রাস্তা নির্মাণসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের ত্রুটির কথা বলেছেন। তবে বিস্ফোরণের জন্য তদন্ত প্রতিবেদনে এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয়নি। 

ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ১৮টি সুপারিশও করেছে তদন্ত  কমিটি। 

ঘটনার পর  ১০ কার্যদিবস তদন্ত শেষ করে মোট ৪০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন আজ বিকালে নারায়ণগঞ্জে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেয়া হয়।

এসময় উপস্থিত ছিলেন তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক খাদিজা তাহেরা ববি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ টি এম মোশারফ হোসেন, ডিপিডিসির পূর্ববিভাগের নিবার্হী প্রকৌশলী গোলাম মোরশেদ,  ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারি পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন, তিতাস গ্যাস ট্রান্সিমিশন কোম্পানীর উপ-মহাব্যবস্থাপক মফিজুল ইসলাম। 

তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়ে জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন জানান, জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি দশ কার্যাদিবসে তিতাস গ্যাস, ডিপিডিসি, মসজিদ কমিটিসহ বিস্ফোরণের সময় প্রত্যাক্ষদর্শী, আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে তদন্ত রির্পোট তৈরি করে জমা দিয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে পাঠানা হয়েছে। 

তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এতে তিতাস গ্যাসের লিকেজ থেকে গ্যাস নির্গত হয়ে মসজিদের ভেতরে জমাট গ্যাস এবং বিদ্যুতের ত্রুটির কারণে স্পার্ক থেকে আগুনের সূত্রপাত ও বিস্ফোরণ ঘটে  ৩৭ জন আহত হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩১ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া মসজিদ কমিটির মসজিদ নির্মাণসহ বিভিন্ন পর্যায়ে  গাফিলতি ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। 

তিনি বলেন, এই মামলাটি বর্তমানে সিআইডি পুলিশ তদন্ত করছে। এই তদন্ত রির্পোট সিআইডির তদন্তে যাতে সহায়তা করতে পারে সেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটির প্রধান খাদিজা তাহেরা ববি জানান, মসজিদের সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া তিতাস গ্যাসের লিকেজ থেকে গ্যাস নির্গত হয়ে মসজিদের ভেতরে জমে যায়। এসির চলার কারণে মসজিদের দরজা জানালা বন্ধ থাকা এবং নামজের সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বিদ্যুৎ লাইন পরিবর্তন করার সময় স্পার্ক থেকে আগুন লেগে বিস্ফোরণ ঘটে। 

তিনি বলেন, তদন্ত কমিটি ৪০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া তদন্ত কমিটি এসব রোধে মোট ১৮টি সুপারিশ করেছে। তার মধ্যে রয়েছে মসজিদ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে হলে দক্ষ প্রকৌশলী দিয়ে ডিজাইন করা, ড্রয়িং ডিজাইন অনুযায়ী নির্মাণ করা, প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ লাইন সংযোজেন সময় ম্যাপ রাখা, গ্যাস লাইনের সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে তা ম্যাপের মাধ্যমে চিহ্নিত করে রাখাসহ বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মসজিদের দুটি বিদ্যুৎ লাইন ব্যবহার করা হতো। যার একটি লাইন ছিল বৈধ, অন্যটি অবৈধ। একটি লাইন ম্যানুয়ালি এবং একটি লাইন অটো ব্যবহার হতো।  যা মসজিদ কমিটির স্বাক্ষরসহ অনেকের বক্তব্যে উঠে এসেছে। ঘটনার দিন (৪ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেই মসজিদে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। এশার ফরজ নামাজ আদায় করে অনেক মুসল্লি সমজিদ থেকে বের হয়ে যান। আনুমানিক ৮টা ৪৫ মিনিটের সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। এসময় অনেক মুসল্লি অন্যান্য নামাজ আদায় করছিলেন। মসজিদের মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন মসজিদের বিদ্যুৎতের লাইন চেঞ্জ করার সময় স্পার্ক হয়। আর সঙ্গে সঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো মসজিদে। মসজিদের ৬টি এয়ারকন্ডিশনের প্লাস্টিক কভার পুড়ে গেছে। এসিগুলোর গ্যাস অদাহ্য হওয়ায় এসির বিস্ফোরণ ঘটেনি।