গতকাল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন একনেক সভাপতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পদ্মা নদীতে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, যা শুষ্ক মৌসুমে ওই অঞ্চলের প্রায় ৬২৩টি ছোট-বড় নদীতে পানিপ্রবাহ বজায় রাখবে। ফলে এ অঞ্চলে বছরে ধান উৎপাদন বাড়বে প্রায় ২৪ লাখ টন এবং মাছ আড়াই লাখ টন।

প্রকল্পের নথি সূত্রে জানা যায়, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের স্থান নির্বাচন করা হয়েছে রাজবাড়ী জেলার পাংশায়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নেয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। প্রথম পর্যায়ের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুনে শেষ হবে।

পদ্মা ব্যারাজ সমীক্ষা প্রকল্পের পরিচালক ও পাউবোর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল হামিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এরপর জিও হবে এবং জুলাই থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরের পানির সংকট নিরসন হবে এবং কৃষি ও মৎস্য চাষে বড় ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে আশপাশের নদীগুলো পুনরুজ্জীবিত হবে এবং সুন্দরবনের অতি লবণাক্ততা হ্রাস পাবে।’

নথিতে আরো বলা হয়েছে, এ প্রকল্পের লক্ষ্য হলো জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ইছামতী-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী সিস্টেমে শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ নিশ্চিত করা। এটি গোদাগাড়ী পাম্প হাউজ, গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতেও সহায়তা করবে। কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহীসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করবে। প্রকল্পটিতে ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যারাজের ওপরের অংশে রাস্তা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন এবং গ্যাস পাইপলাইনের জন্য একটি বহুমুখী করিডোর করা হবে।

প্রকল্পটির লক্ষ্যমাত্রায় বলা হয়েছে, পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হলে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহীসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর প্রায় ২৮ দশমিক ৮০ লাখ হেক্টর আবাদি জমিতে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বার্ষিক ধান উৎপাদন ২৩ দশমিক ৯০ লাখ টন এবং মাছ উৎপাদন ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন বৃদ্ধি পাবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নকালে প্রায় ৪৭ হাজার ৯৫০ জন শ্রমিকের জন্য প্রায় ১২ দশমিক ২৫ কোটি জন-দিন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এছাড়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ লাখ ২৭ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এছাড়া ৩ হাজার ৪৫০ একর জমিতে প্রায় দেড় লাখ পরিবারের জন্য সাতটি স্যাটেলাইট শহর এবং আধুনিক গ্রামীণ জনপদ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এছাড়া প্রকল্পটি দেশের অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখবে বলে দাবি করা হয়েছে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে। এ প্রকল্প থেকে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা প্রত্যক্ষ রিটার্নের সুযোগ তৈরি হবে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটিকে সরকারের মাস্টারমাইন্ড প্রকল্প বলে মন্তব্য করেছেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। গতকাল একনেক সভা শেষে সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পটি আমাদের একটি মাস্টারমাইন্ড প্রকল্প। প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের তিন ভাগের এক ভাগ অঞ্চল, ২৪টি জেলা ও সাত কোটি মানুষ উপকৃত হবেন, যা মোট জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ। আমি মনে করি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকার পাবে এবং দেশের রাজস্ব খাতে বিরাট ভূমিকা রাখবে।’

পানিসম্পদ মন্ত্রী আরো বলেন, ‘ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে আমরা ওই অঞ্চলে মাত্র ১৫ শতাংশ পানি পাই, যা শুষ্ক মৌসুমে খরার সৃষ্টি করে। আমরা এ পদ্মা ব্যারাজ করার মাধ্যমে মানুষকে সুবিধা দিতে পারব। সেটা কৃষির জন্য হোক, সুন্দরবনের লবণাক্ততা হ্রাস ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ভূমিকা রাখবে। পদ্মার সঙ্গে সংযুক্ত নদীগুলো আর শুকিয়ে যাবে না। এসব বিবেচনায় সরকার প্রকল্পটি অনুমোদন করেছে। এছাড়া এটি বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহার ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি ছিল।’

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, ৬০-এর দশকে পদ্মার বাংলাদেশ অংশে একটি ব্যারাজ নির্মাণে গঙ্গা ব্যারাজের ধারণাটি নিয়ে কাজ শুরু হয়। ১৯৬১ সালে হয় প্রথম সমীক্ষা। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে চারটি প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা হয়। ২০০২ সালে পানিসম্পদকে পরিকল্পনা সংস্থা সুপারিশ করেছিল যে ব্যারাজটি কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ি অথবা রাজবাড়ীর পাংশায় নির্মাণ করা যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই ও ডিজাইন সম্পন্ন হয়। পরবর্তী সময়ে পাউবো নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ করে। ২০১৮ সালের পর পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ পরিকল্পনা আলোচনা থেকে হারিয়ে যায়। এর পর ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রকল্পটি ফের আলোচনায় আসে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার গত জানুয়ারিতে অনুমোদনের চেষ্টা করলেও বড় বাজেট হওয়ায় শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। তৎকালীন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ প্রকল্পটি নির্বাচিত সরকার বাস্তবায়ন করবে বলে মন্তব্য করেন। ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের ইশতাহারে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানায়। এছাড়া রাজশাহীতে এক নির্বাচনী সভায় ব্যারাজের ঘোষণা দেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. জাহাঙ্গীর আলম পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদনকে দেশের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। গতকাল তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের কৃষি ও মৎস্য সম্পদের জন্য এটি বড় ইতিবাচক খবর। পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন-বিপণন বৃদ্ধি পাবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এ অঞ্চলে বিরাট আবাদি জমি আছে, যা শুষ্ক মৌসুমে সেচের অভাবে মরুভূমি হয়ে যায়। পদ্মার পানি সংরক্ষণ করা গেলে সে পানি দিয়ে আবাদ হবে। নদীগুলোতে পানি থাকবে, যার মধ্য দিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।’