টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারে নরম হয়ে যাওয়া মাটির ঘরগুলো পানি পুরোপুরি নামার আগেই একের পর এক ধসে পড়ছে। এখনো নিচু এলাকার ঘরবাড়ি, সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক অংশ পানির নিচে। অধিকাংশ নলকূপ তলিয়ে থাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। বন্যাদুর্গত এলাকায় সাপে কাটার ঘটনাও বেড়েছে।

গতকাল সরজমিনে বাঁশখালীর পূর্ব পুঁইছড়ি, ছনুয়া, গণ্ডামারা, খানখানাবাদ ও বাহারছড়া ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, পাহাড়ি ঢলের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে এসব এলাকায়। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন পশ্চিমাঞ্চল ও বেড়িবাঁধসংলগ্ন গ্রামগুলোতে অধিকাংশ বসতঘর টিন, বাঁশ ও মাটির তৈরি হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ভয়াবহ। পানি নামতে শুরু করলেও মাটির দেয়াল নরম থাকায় প্রতিদিনই নতুন নতুন ঘর ধসে পড়ছে। অন্যদিকে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার সংকটে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।

ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মিনু বানু রায়ের ৭০ বছরের পুরনো মাটির ঘরটি এবারের বন্যায় পুরোপুরি ধসে পড়েছে। জীবনে বহু ঝড়-জলোচ্ছ্বাস দেখলেও এমন ভয়াবহ বন্যা আগে দেখেননি বলে জানান তিনি। স্বামীকে হারানোর পর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে এ ঘরেই ছিল তার ছোট্ট সংসার। এখন সেই ঘরের জায়গাজুড়ে কাদা আর ভাঙা মাটির স্তূপ। প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তার।

বন্যার ধাক্কা শুধু বসতঘরেই সীমাবদ্ধ নয়, বড় আঘাত লেগেছে জীবিকায়ও। ছনুয়া ইউনিয়নের একটি পরিবার ক্ষুদ্র ঋণের অর্থে ১০টি গরু পালন করে সংসার চালাত। দুধ বিক্রিই ছিল তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। কিন্তু বন্যায় গোখাদ্যের মজুদ নষ্ট হওয়ায় দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য সংকট। বিশুদ্ধ পানির অভাবে গবাদিপশুকে বন্যার পানি পান করাতে হচ্ছে। এতে অনেক গরু জ্বর, খুরাসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, দূষিত পানি পান করায় অনেক গরু পেট ফুলে মারা যাচ্ছে। ফলে বসতঘরের পাশাপাশি জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বনও হারাচ্ছেন বন্যাদুর্গতরা।

বন্যায় পৈতৃক মাটির ঘর হারিয়ে বৃদ্ধ মাকে নিয়ে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন একই ইউনিয়নের আলমগীর হোসেন। এনজিও ও ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের টাকায় কেনা তিনটি গরুর একটি অসুস্থ। ঘর পুনর্নির্মাণ, ঋণের কিস্তি ও সংসার চালানো নিয়ে চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি।

দুর্গত এলাকার মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়েছে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা। অনেক গ্রামে এখনো সড়কপথে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৃষ্টি বন্ধ হওয়ায় বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাঁশখালীর পরিস্থিতিও দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি। আশ্রয় কেন্দ্র থেকে মানুষ বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। তবে উপজেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঘরবাড়ি মাটির তৈরি হওয়ায় পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো একে একে ধসে পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব ঘরের মূল্যায়ন (অ্যাসেসমেন্ট) শুরু করেছি। সুপেয় পানির সংকট মোকাবেলায় আপাতত পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ করা হচ্ছে।’

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্যার কারণে এখন পর্যন্ত কয়েকটি উপজেলায় ৮৫ জন সাপে কাটা রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার সংকটের কারণে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী সব স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়েছে।’