মেহেরপুর জেলার সীমান্ত এলাকায় নারী শিক্ষার অগ্রযাত্রায় ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে বাইসাইকেল। এখন আর অপেক্ষা করতে হচ্ছে না যানবাহনের জন্য। ব্যয় করতে হচ্ছে না বাড়তি টাকা। মেয়েরা দল বেঁধে বিদ্যালয়ে আসে সাইকেল চেপে। সড়কে কোনো বখাটে তাদের সহজে উত্ত্যক্ত করতে পারছে না। এছাড়া সামাজিক কুসংস্কারের বিষয়টিও আর থাকে না। আর
নিরাপদ এ বাহনের কারণেই সীমান্ত এলাকার স্কুলগুলোয় বাড়ছে নারী শিক্ষার হার।
তথ্যসূত্র বলছে, স্বাধীনতার সূতিকাগার মেহেরপুর জেলাজুড়েই রয়েছে ভারতীয় সীমান্ত। সীমান্তঘেঁষা জেলাটি কৃষিসমৃদ্ধ হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনো দুর্গম। কারণ জেলার তিনটি উপজেলার চারদিকেই ভারতীয় সীমান্ত। অন্যদিকে কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলা। দুই জেলার এক কোণে মেহেরপুর হওয়ায় এখানে গড়ে ওঠেনি তেমন শিল্প-কারখানা। কৃষিই একমাত্র ভরসা জেলাবাসীর। ফলে সীমান্ত জেলা হওয়ায় মাদকের আগ্রাসন ও বাল্যবিবাহের হার বেশি। এতে শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে মেহেরপুর জেলা।
বছর পাঁচেক আগেও মেহেরপুর জেলার তিন উপজেলার সীমান্ত এলাকার রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অনুন্নত। সেই সঙ্গে ছিল সামাজিক কুসংস্কার। নারী শিক্ষাকে কেউ ভালো চোখে দেখত না। তার ওপর মেয়েদের সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাওয়া ছিল আকাশকুসুম ভাবনা। দিন বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবন ব্যবস্থা। সীমান্ত এলাকার রাস্তাঘাট এখন কিছুটা উন্নত হলেও যানবাহন অপ্রতুল। তাই মেয়েরা নির্বিঘ্নে বিদ্যালয়ে আসার জন্য বাহন হিসেবে বেছে নিয়েছে বাইসাইকেল। এতে করে তারা সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে আসতে পারছে। গুনতে হচ্ছে না বাড়তি খরচ। বিষয়টিকে শিক্ষার অগ্রযাত্রার মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করছে সচেতন মহল।
গাংনী উপজেলার রামদেবপুর গ্রামের অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী কানিজ ফাতেমা জানায়, আগে স্কুলে যেতে ভ্যান ও বিভিন্ন যানবাহন পেতে দেরি হতো। পাশাপাশি বাড়তি টাকা গুনতে হতো, বর্তমানে আমাকে স্কুল থেকে একটি বাইসাইকেল দেয়া হয়েছে। নিজেই সাইকেল চালিয়ে চলে যাই। বিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে খরচ ছাড়াই অল্প সময়ে বাড়ি পৌঁছে যাই।
একই উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া ইসলামিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী সাথী আক্তার জানায়, আগে যখন সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসতাম তখন আমাদের পরিবারের বয়স্ক ও সমাজের মানুষেরা কটু কথা বলত। আবার ছেলেরা রাস্তার পাশে বসে কটূক্তি করত। কিন্তু এখন আমরা অনেকে একসঙ্গে মজা করতে করতে চলে আসি। পরিবারের কেউ কিছু বলে না। আবার বখাটেরাও বিরক্ত করে না। এছাড়া শিক্ষায় আমাদের আগ্রহ আগের
চেয়ে বেড়েছে।
সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র রাব্বি বলে, আমরা স্কুলে আসি বড় আপু বা ছোটদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে করতে। আগে তো মেয়েরা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসত না, কিন্তু বর্তমানে শতাধিক মেয়ের মধ্যে ৬০ জনই সাইকেল চালিয়ে আসে।
নবম শ্রেণীর ছাত্রী ঝিলিক বলে, মেয়ে শিক্ষার্থীদের বাইসাইকেল চালানো কেউ পছন্দ করত না। এখন প্রয়োজনের তাগিদে সাইকেল চালাতে হয়। অনেকেই বাঁকা চোখে দেখত। এখন আর তা নেই।
তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের অভিভাবক আরিফুল ইসলাম বলেন, মেয়েদের সাইকেল চালানোটা অনেকে কু-নজরে দেখত। এখন আর কেউ কিছু মনে করে না। সাইকেলে বিদ্যালয়ে যাওয়ায় অনেক খরচ কমেছে। আর মেয়েরাও সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারছে। অনেক অভিভাবক মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে না পেরে বাল্যবিবাহ দিতেন। এখন আর কেউ বাল্যবিবাহ নিয়ে ভাবেন না।
তেঁতুলবাড়িয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আনিছুজ্জামান জানান, আগে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিল না। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসতে নানা ভোগান্তি পোহাতে হতো। যাতায়াত ব্যয় সংকুলান করতে না পারায় দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা বিদ্যালয়ে নিয়মিত আসতে পারত না। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটেছে। অনেক পরিবার মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছে বাইসাইকেল দিয়ে। জনপ্রতিনিধিরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মেধাবী ও অসচ্ছল পরিবারের মেয়েদের সাইকেল উপহার দিয়েছেন। ফলে তারাও এখন নিয়মিত ও স্বাচ্ছন্দ্যে বিদ্যালয়ে আসতে পারছে। দল বেঁধে বিদ্যালয়ে আসায় বখাটেরা তাদের উত্ত্যক্ত করতে পারে না। ক্লাসে উপস্থিতির হারও বেড়েছে।
তেঁতুলবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি নাজমুল হুদা বিশ্বাস বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনেক সাইকেল এ বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের উপহার দেয়া হয়েছিল। এতে করে মেয়েরা স্কুলমুখী হয়েছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মীর হাবিবুল বাশার বলেন, সীমান্তবর্তী বিদ্যালয়গুলোয় একসময়ে বাল্যবিবাহ ছিল, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিল, তাদের মেয়েদের ঘর থেকে বের হতে দিত না। ছিল শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত, আজ দেখছি ভিন্ন চিত্র। এখন সীমান্ত এলাকার অনেক অসচেতন অভিভাবকও নিজের মেয়েকে একটি বাইসাইকেল কিনে দিচ্ছেন। বাইসাইকেল কেনার ফলে একটি পাড়া-মহল্লার অনেক মেয়েরা একসঙ্গে বিদ্যালয়ে আসতে পারছে। এতে করে কয়েকটি সুবিধা হয়েছে, একসঙ্গে অনেকে সাইকেলে করে খুব সহজে স্কুলে আসতে পারছে, বখাটেদের উত্ত্যক্তের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারছে। এর দেখাদেখি পাশের এলাকা বা গ্রামের অভিভাবকও তাদের মেয়েদেরও সাইকেল কিনে দিচ্ছেন। এতে যাতায়াত ভাড়া বেঁচে যাচ্ছে তাদের। এখনো অনেক দরিদ্র মেয়েরা আছে, যাদের পরিবার থেকে সাইকেল কিনে দিতে পারেনি আর্থিক সমস্যার কারণে। সব কুসংস্কার পেছনে ফেলে মেহেরপুরের সীমান্ত এলাকার নারীরা সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে আসছে, যা ইতিবাচক।
গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী খানম জানান, সীমান্ত এলাকায় বাইসাইকেলে নারী শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া খুব ভালো সংবাদ। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের সাইকেল দেয়া হয়েছে। তবে সীমান্ত এলাকায় বাল্যবিবাহ ও নারী শিক্ষার হার বাড়াতে এটা এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমরা সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পাশে দাঁড়াতে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাব।
জেলা শিক্ষা অফিসার মাহফুজুল হোসেন বলেন, সীমান্ত এলাকায় দিন দিন নারী শিক্ষার্থী বাড়ছে, এটা শুভ সংবাদ।
মেহেরপুর জেলা প্রশাসক ড. মুনসুর আলম জানান, ইউনিয়ন পরিষদগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীকে অনেক সাইকেল দেয়া হয়েছে। এখন থেকে সীমান্ত এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।










