ভাষাশহীদ আবদুস সালামের গ্রামের বাড়ি ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার লক্ষণপুর (বর্তমানে সালামনগর) গ্রামে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে হওয়ায় সারা বছর কেউ সালাম পরিবার ও এলাকার খোঁজ রাখে না।

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি শুরু হলেই কদর বাড়ে এ গ্রামের। এ মাসেই গ্রামটিতে পা রাখেন দেশের বিশিষ্টজন ও প্রশাসনিক কর্তারা। খবরের সন্ধানে ঘুরে ফেরেন গণমাধ্যমকর্মীরাও। ভাষাশহীদ সালামের নামে তার বাড়ির দরজায় ভাষাশহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হলেও সেখানেই বছরজুড়ে থাকে সুনসান নীরবতা।

ভাষাশহীদ সালাম সম্পর্কে আগামী প্রজন্মকে জানাতে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তিকরণ, গ্রামের বাড়ির সামনে উচ্চবিদ্যালয় স্থাপন, জাদুঘরে স্মৃতি সংরক্ষণ ও গ্রন্থাগারে নতুন বই সংযোজন এবং একটি বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি করেছেন স্থানীয়রা। এছাড়া শহীদ সালামদের রক্তের বিনিময়ে স্বীকৃতি পাওয়া ভাষা বাংলাকে সর্বস্তরে চালুর দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা।

১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের লক্ষণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ভাষাশহীদ আবদুস সালাম। বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলনে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন তিনি। সেখানে পুলিশের গুলিতে আহত হন আবদুস সালাম। পরে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই বছরের ৭ এপ্রিল মারা গেলে তাকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরিবার ও স্বজনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভাষা আন্দোলনের ৬৫ বছর পর ২০১৭ সালে আজিমপুর কবরস্থানে আবদুস সালামের কবর শনাক্ত করা হয়।

ভাষাশহীদ আবদুস সালামকে স্মরণীয় করে রাখতে তার নিজ গ্রাম লক্ষণপুরের নাম পরিবর্তন করে সালামনগর করা হয়েছে। তার বাড়ির সামনে লক্ষণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ভাষাশহীদ আবদুস সালাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় করা হয়েছে।

ভাষা শহীদ আবদুস সালামের ছোট ভাই আবদুল করিম জানান, আমাদের বাড়ির দরজায় স্থাপিত গ্রন্থাগারকে সচল রাখতে দরকার পাঠকের আনাগোনা। পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়কে উচ্চবিদ্যালয়ে রূপান্তর করা গেলে নতুন পাঠক সৃষ্টি হবে। তাছাড়া এটিকে স্মৃতি জাদুঘর নাম দেয়া হলেও মূলত এখানে সালামের কোনো স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়নি।

সরেজমিনে ভাষাশহীদ সালাম স্মৃতি পাঠাগার ও জাদুঘরে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকদিন আগেই ভবনটিকে পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। সেখানে কয়েকজন পাঠক বিভিন্ন রকমের বই পড়ছেন। গ্রন্থাগারিক মো. লুত্ফর রহমান বাবলু জানান, গ্রন্থাগারে সাড়ে তিন হাজার বই রয়েছে। সব বই প্রায় পুরনো। বছরজুড়ে গ্রন্থাগারটিতে পাঠকের আনাগোনা কম থাকে। পাশের রাস্তাটি সংস্কার হওয়ায় বর্তমানে পাঠকের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও নতুন বই না থাকায় অনেকে এখানে আসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। তিনি জানান, পাঠাগারে বর্তমানে দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, ভাষা আন্দোলনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক বই রয়েছে। ভাষাশহীদ সালামের ওপর বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বইটি এখনো সরবরাহ করা হয়নি।

ভাষাশহীদ আবদুস সালাম স্মৃতি পরিষদের সভাপতি ও ফেনী রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন জানান, ভাষা আন্দোলনের গৌরবগাথা ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সালামদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা দেশের সর্বস্তরে চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। সালামনগরে জনসমাগম নিশ্চিত করার জন্য সেখানে একটি পার্ক অথবা বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানান সালাম পরিষদের এ নেতা।

ফেনী জেলা প্রশাসক আবু সেলিম মাহমুদ উল হাসান জানান, ভাষাশহীদ সালামের গ্রামের সঙ্গে আগামী প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্থানীয়দের দাবির সম্ভাব্যতা যাছাই করে সেখানে বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায় কিনা তা নিয়ে ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।