খুলনা নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৪ সালে প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ময়ূর নদ খনন করা হয়েছিল। কিন্তু সে উদ্যোগ কাজে আসেনি বলে দাবি করেছেন নাগরিক নেতারা। তাদের মতে, সঠিক সিদ্ধান্ত, খননে অনিয়ম, দখল, পরিবেশ বিষয়ে অসচেতনতা, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ না থাকাসহ নানা কারণে নদ ফিরেছে পুরনো চেহারায়। আর ভরাট হওয়া ময়ূর নদই এখন খুলনা নগরীর জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ।

পরিবেশ-সংশ্লিষ্টরা জানান, নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ২০টিরও বেশি নালার মুখ ময়ূর নদের সঙ্গে যুক্ত। শহরের মানবসৃষ্ট বর্জ্যের সবটুকু নিষ্কাশনের ক্ষমতা খুলনা সিটি করপোরেশনের নেই। ফলে প্রতিদিন বর্জ্যের একটি বড় অংশ এসব নালা-নর্দমার মাধ্যমে ময়ূর নদে মিশছে। এতে বিষাক্ত হচ্ছে নদের পানি। দখলে সংকুচিত হচ্ছে আয়তন। নদ ভরাট হয়ে বাড়ছে জলাবদ্ধতা। নামমাত্র নদ খনন করে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হচ্ছে।

খুলনা সিটি করপোরেশন বলছে, প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয় ধরে আবারো ময়ূর নদ খননের পাশাপাশি খুদে খাল খননসহ আরো বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ও জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক মনজুুরুল ইসলাম বলেন, খুলনা নগরীর ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় নদটি খনন করা হচ্ছে। পাঁচ মাস আগে ময়ূর নদ খননের কার্যাদেশ মিললেও তখন বর্ষা মৌসুম ছিল। যে কারণে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল। চলতি মাসের শুরু থেকে আবারো খননের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন লে-আউট ও খনন-পূর্ব অবস্থা পরিমাপ চলছে। ২০২৫ সালের মধ্যে বেশির ভাগ প্রকল্পের কাজ হয়ে যাবে।

প্রকল্প অনুমোদনের চার বছর পর কাজ শুরুর বিষয়ে তিনি বলেন, দুুই বছর করোনা ছিল। কোনো কাজ করা যায়নি। তবে অন্য দুুই বছরের বিষয়ে কোনো সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবির উল জব্বার জানান, প্রায় ৮২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয় ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে ৩৯৩ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর। প্রকল্পের আওতায় ময়ূর নদ খননে কেসিসির ব্যয় হবে ৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। আর খুদে খাল খননে ব্যয় হবে ৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা।

আবির বলেন, প্রকল্পে নদের দুই পাড় বাঁধাই করে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, তিনটি ঝুলন্ত সেতু, বিনোদনের জন্য নৌকা চালানোর ব্যবস্থা, পানি নিষ্কাশন ও পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ সারা বছর নদ খননের জন্য ভাসমান এক্সাভেটর, কচুরিপানা অপসারণের জন্য যন্ত্র, খালের মুখে পরিশোধন নেটসহ বিভিন্ন যন্ত্র কেনার কথা রয়েছে।

খুলনা সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ভৈরব ও রূপসা নদীর মিলনাস্থলে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার রূপসা নদী থেকে হাতিয়া নামে উত্পত্তি হয়ে একটি নদী পুটিমারী ও তেঁতুলতলা গ্রামের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গল্লামারী ব্রিজ থেকে ময়ূর নদ নামে প্রবেশ করেছে নগরীতে। যেটি খুলনা নগরীর হূিপণ্ড হিসেবে পরিচিত।

এ নদ সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম পাশ দিয়ে রায়ের মহল হয়ে বয়রা জেলেপাড়া বাজারের পাশঘেঁষে লতা পাহাড়পুর (দেয়ানার শেষ সীমানা) গিয়ে খুদিয়ার খাল নামে বিল ডাকাতিয়ায় মিশেছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে নগরীতে ৬০ ও নগরীর বাইরে রয়েছে ৪০ শতাংশ।

স্থানীয়রা জানায়, আগে রূপসা নদীর সঙ্গে ময়ূরের সরাসরি সংযোগ থাকলেও এখন বদ্ধ নদ। বটিয়াঘাটার আলুতলা জলকপাটের মাধ্যমে এর জোয়ার-ভাটা নিয়ন্ত্রিত হলেও জলকপাট বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকে। ফলে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এক সময়ের স্রোতস্বিনী নদটি এখন গতিহীন মরা খাল। যে কারণে একটু বৃষ্টি হলেই নগরীতে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা।

সরেজমিনে দেখা যায়, গল্লামারী এলাকার পাশাপাশি দুটি সেতুর নিচে বর্জ্যে সয়লাব। দুর্গন্ধে পথ চলাই দায়। গল্লামারী বাজারের আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে স্থানটি। পাড়ে জন্মানো আগাছা একেবারে মাঝ নদে চলে গিয়েছে। নর্দমার আবর্জনাময় পানি এসে পড়ছে নদে। কচুরিপানায় ঢাকা যতটুকু অংশে পানির দেখা মেলে, তা কালচে রঙের।

খুলনার পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের সভাপতি ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, ময়ূর নদ খননের নামে শুধু টাকা তছরুপই হচ্ছে, সুফল মিলছে না। দখল-দূষণের দাপট ও প্রবাহ না থাকায় নদটি শুকিয়ে মরতে বসেছে। একাধিকবার নদের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু বারবার সবকিছু দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

তিনি বলেন, আমাদের দাবি ছিল নদের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সিএস ম্যাপ অনুযায়ী সীমানা উদ্ধার করে পিলার দেয়া এবং শুধু নগর এলাকায় থাকা নদের অংশ খনন না করে বটিয়াঘাটার আলুতলা থেকে খনন করা। তা না হলে আলুতলার জলকপাট সঠিকভাবে পরিচালনা করা, কিন্তু  খুলনা সিটি করপোরেশনের সে ব্যাপারে কোনো নজর নেই।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ জামান বলেন, নদটি এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। আগের বার খনন কোনো কাজে আসেনি। নামকাওয়াস্তে খনন করা হয়েছিল। ভালো খনন হলে তবেই সুফল আশা করা যায়।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক বলেন, আগেরবার কতটুকু মাটি কাটা হয়েছে, কেউ দেখতে পায়নি। এবার খননকাজে কোনো ড্রেজার ব্যবহার করা হবে না। বাঁধ দিয়ে পানি শুকিয়ে ভেকু ও শ্রমিক দিয়ে মাটি কাটা হবে।