‘আল্লাহ-রসুলের নাম লইয়া নাও খোলোরে/ সোনার নায়ে পবনের বৈঠা ধর রে/ হেইয়্যাবোল-হেইয়্যাবোল।’ কিংবা ‘সোনার নায়ে রুপার বৈঠা, কে বাইয়া যায়/ ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায়’—এমন গানের তালে তালে নৌকাবাইচ ছিল বাংলার অতি পরিচিত একটি দৃশ্য। একবিংশ শতাব্দীতে খুব বেশি চোখে না পড়লেও নব্বইয়ের দশকেও বাংলার অন্যতম উৎসবের নাম ছিল নৌকাবাইচ। বছরের শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে এ উৎসব পালিত হয়ে থাকে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নৌকাবাইচের প্রচলন বহু প্রাচীন। মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় ইউফ্রেতিস নদীতে এবং পরে মিসরীয় সভ্যতায় নীল নদে নৌকা চালনার প্রতিযোগিতার ইতিহাস পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে এ প্রতিযোগিতা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯০০ সালে অলিম্পিকেও নৌকাবাইচ অন্তর্ভুক্ত হয়।

বাংলার ইতিহাসেও নৌকাবাইচের প্রচলন বহু পুরনো। রাজা-বাদশাহদের আমল থেকেই বর্ষাকালের অন্যতম বিনোদন ও উৎসব ছিল নৌকাবাইচ। তবে বাংলাদেশে ঠিক কবে থেকে গণবিনোদন হিসেবে এর প্রচলন শুরু হয়, তার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায় না। এ নিয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি জনশ্রুতি।

একটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের সোনাইজানী নদীতে নৌকাবাইচের উৎপত্তি। কথিত আছে, এ নদীর তীরে অবস্থিত শ্রীচৈতন্যদেবের আখড়ায় একদিন মনসা দেবী মনুষ্যরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ঘাটের উত্তর ও দক্ষিণ দিকের দুই জেলে তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রেমের প্রস্তাব দেন। কার প্রস্তাবে সাড়া দেবেন, তা নির্ধারণ করতে মনসা দেবী শর্ত দেন—নৌকা নিয়ে লাল গোঁসাইয়ের আখড়া থেকে চৈতন্যদেবের আখড়ায় যার নৌকা আগে আসবে, তার প্রস্তাবেই তিনি সাড়া দেবেন।

জেলেরা সেই শর্ত মেনে একসঙ্গে নৌকাবাইচে অংশ নেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মনসা দেবী কারো প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া দেননি, বরং সেই দুই প্রতিযোগী জেলের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং নৌকা নিয়ে প্রতিযোগিতার সেই স্মৃতি অমর করে রাখতে প্রতি বছর সোনাইজানী নদীতে নৌকাবাইচ আয়োজনের নির্দেশ দেন। সেই থেকেই এ নৌকাবাইচের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

আরেক জনশ্রুতি জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রাকে ঘিরে। স্নানযাত্রার সময় অসংখ্য নৌকার ছোটাছুটি থেকে মাঝি-মাল্লা ও যাত্রীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার আনন্দ তৈরি হয়। কালক্রমে তা নৌকাবাইচে রূপ নেয়।

তৃতীয় জনশ্রুতি গাজী পীরকে ঘিরে। আঠারো শতকের শুরুর দিকে মেঘনা নদী পার হয়ে তার কাছে আসতে ভক্তরা নৌকায় যাত্রা করলে আশপাশের অনেক নৌকাও ছুটে আসে। একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা সেই নৌকাগুলো থেকেই নৌকাবাইচের গোড়াপত্তন হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

ঠিক কবে, কোথায় ও কীভাবে নৌকাবাইচ উৎসবের প্রথম প্রচলন ঘটে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। বিভিন্ন জনশ্রুতি থেকে এটুকু বোঝা যায়, বাংলার নদীকেন্দ্রিক জনজীবনে নৌকাবাইচের ঐতিহ্য বহু পুরনো। শিশু-কিশোর থেকে বয়োবৃদ্ধ—হাজারো মানুষের আবেগ-উত্তেজনার মুহুর্মুহু কলধ্বনিতে এটি ছিল গ্রাম বাংলার নির্মল আনন্দের অন্যতম খোরাক।

গত কয়েক দশক ধরে নদী দখল, দূষণ ও নাব্যতা কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে এ লোকসংস্কৃতি অনেকটাই হারাতে বসেছে। তবে চলতি বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ বিরতি ভেঙে আনন্দ-আমেজ আর ঐতিহ্য নিয়ে ফিরেছে এ আয়োজন। রাজধানীর নবাবপুরে ৩৫ বছর পর, শরীয়তপুরের কীর্তিনাশা নদীতে ৩০ বছর পর এবং নবাবগঞ্জের ইছামতি নদীতে ২০ বছর পর অনুষ্ঠিত হয়েছে নৌকাবাইচ। দুই বছর বন্ধ থাকার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীতেও ফিরেছে এ উৎসব। ফরিদপুরের ভাঙ্গায় কুমার নদে দীর্ঘ বিরতির পর নৌকাবাইচ ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ।

এছাড়া বরিশালের উজিরপুর, রংপুরের ঘাঘট নদী, মাদারীপুরের আড়িয়াল খাঁ, সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও বেলকুচি, নরসিংদীর শিবপুর, মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের ইছামতি নদী, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ীর কালুখালীর মহেন্দ্রপুর খেয়াঘাট, কিশোরগঞ্জের নিকলী ও ইটনা এবং ঝালকাঠিতেও নৌকাবাইচের আয়োজন হয়েছে।

এসব আয়োজন উপভোগ করতে নদীর দুই তীরে ঢোলের তালে উল্লাস আর হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে তৈরি হয় আনন্দমুখর পরিবেশ। কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে এসে উপভোগ করেন ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিযোগিতা। নদী কিংবা খালের দুই পাড় ছাড়িয়ে আশপাশের সড়ক ও বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন দর্শনার্থীরা। আকাশজুড়ে কালো মেঘ, নদীর বুকজুড়ে ঢেউ খেলানো পানি—এমন পরিবেশে প্রতিধ্বনিত হয় মাঝিদের ‘হা-দে-রে-ও’ কোরাস।

বরিশালের সন্ধ্যা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা উপভোগ করছিলেন বৃদ্ধ সিরাজ মিয়া। তার পাশে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বসিত আট বছরের নাতি। সিরাজ মিয়া বলেন, ‘আমাদের সময় নৌকাবাইচ ছিল গ্রামের সবচেয়ে বড় উৎসব। আজ নাতিকে নিয়ে এসেছি, যেন সে দেখতে পারে আমাদের সেই ঐতিহ্য। আগে আমাদের এলাকায় বৈশাখে কিংবা কালীপূজার সময় প্রতি বছর নৌকাবাইচ হতো। অনেক দিন পর এ উৎসবে এসে পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে গেল।’

কিশোরগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা ইকবাল হোসেন বলেন, ‘গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও লোকজ সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। নৌকাবাইচের মতো আয়োজন নিয়মিত হলে নতুন প্রজন্ম এসব ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।’

বাইচ দেখতে আসা একই এলাকার রাজন মিয়া বলেন, ‘আমরা এখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছি। নৌকাবাইচের মতো গ্রামীণ ঐতিহ্যগুলোও হারিয়ে যাওয়ার পথে। অথচ এ ধরনের আয়োজন মানুষকে একত্রিত করে, নির্মল আনন্দের সুযোগ করে দেয়।’

৩০ বছর পর শরীয়তপুরে অনুষ্ঠিত নৌকাবাইচ দেখতে আসা সুমন ঠাকুর বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর কীর্তিনাশা নদীতে এমন আয়োজন হওয়ায় আমরা আনন্দিত। আমরা চাই, সামনে আরো বড় পরিসরে আয়োজন করা হোক। তাহলে এটি আমাদের জন্য একটি বিনোদনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়াবে।’

বরিশালের সন্ধ্যা নদীর নৌকাবাইচে অংশ নেয়া গোপালগঞ্জের প্রতিযোগী লাজারেস ফলিয়া বলেন, ‘এর আগে আমরা উজিরপুরের হারতায় ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচে অংশ নিয়েছিলাম, কিন্তু সন্ধ্যা নদীতে এবারই প্রথম। এত মানুষের ভালোবাসা ও উৎসাহ আমাদের দলকে দারুণ অনুপ্রেরণা দিয়েছে।’