সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, এতদিন রাজস্ব সংস্কারকে কেবল একটি কারিগরি বিষয় হিসেবে দেখা হতো, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কর কাঠামোর সংস্কার সবসময় টেকনিক্যাল লোক দিয়ে করানোর ফলেই দেশ ‘লো লেভেল ইকুইলিব্রিয়াম ট্র্যাপে’ আটকে রয়েছে। রাজস্ব আদায়ের মূল ভিত্তি হলো রাজনীতি এবং জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের ‘সামাজিক চুক্তি’, যা আমাদের রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার সঙ্গে জড়িত।
আজ শনিবার রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির ন্যাশনাল থিয়েটার হলে পলিসি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের (পিপিআরসি) আয়োজনে 'রেভিনিউ মোবিলাইজেশন: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অপরচুনিটিজ' শীর্ষক একটি প্রি-বাজেট আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান।
ড. তিতুমীর জানান, আসন্ন বাজেটে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে কর কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাবে, যা সংস্কারের প্রতি রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রমাণ। কর ব্যবস্থার মূল অসুখ হলো ‘পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি’ বা এসআরও কালচার, যা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে কর অব্যাহতি দিয়ে সুবিধা প্রদান করে।
দেশের সব ক্ষেত্রে একই হারে (যেমন ১৫ শতাংশ) ভ্যাট দেয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এতে দরিদ্র মানুষের ওপর চাপ বাড়ে এবং গবেষণায় দেখা গেছে এমন পদক্ষেপে লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে।
রাজস্ব আদায়ে হয়রানি বন্ধ করতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতে পুরো ব্যবস্থাকে ডিজিটাইজড এবং ক্যাশলেস করার ওপর জোর দেন তিনি। এছাড়াও ধানমন্ডি বা বনানীর মতো অভিজাত এলাকার রেস্টুরেন্টগুলোর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে কেনাকাটা হলেও সরকার সঠিক পরিমাণে ভ্যাট পাচ্ছে না। এ সমস্যা সমাধানে ‘রিস্ক বেসড অডিটিং সিস্টেম’ এবং এইচএস কোড সংক্রান্ত জটিলতা দূর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
উপদেষ্টা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতি নির্ধারণ এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আলাদা করা হবে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব এবং এনবিআর চেয়ারম্যান একই ব্যক্তি হওয়ার যে প্রথা রয়েছে, তা সংস্কারের জন্য একটি কমিটি কাজ করছে। ভারত ও পাকিস্তানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, আমলাতন্ত্রের সাথে আলোচনার মাধ্যমেই এ সংস্কার বাস্তবায়ন করা হবে।
ড. তিতুমীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, যে দেশে ৫১ শতাংশ ‘লার্নিং পোভার্টি’ রয়েছে এবং স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ খরচ হয় না (জুন সিনড্রোম), সেখানে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকারের লক্ষ্য, স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় মোট বরাদ্দের ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। তিনি আরো বলেন, সরকার রাজস্বের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বা পরিমাণ বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে, যার প্রতিফলন জুলাই মাস থেকেই দেখা যাবে।
তিনি জানান, এটি আমাদের দেশ এবং আমরা সবাই মিলে কাজ করছি। ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ কমানো এবং নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোই বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার, এপেক্স ফুটওয়্যারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, অতিরিক্ত কর কমিশনার ড. মো. নুরুল আমিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিক্সের পরিচালক প্রফেসর শফিউন এন. শিমুল, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ অফিসের অপারেশনস ম্যানেজার গেইল মার্টিনসহ আরো অনেকেই বক্তব্য দেন।










