রাতের খাবার খেয়ে পেট ভরে গেছে। কিছুক্ষণ টেলিভিশন দেখা কিংবা মোবাইলে সময় কাটানোর পর হঠাৎ মনে হলো, একটু মিষ্টি খেলে ভালো লাগত। আর তখনই ফ্রিজে রাখা চকলেট-মিষ্টি, চানাচুর-বিস্কুটের কৌটা কিংবা পছন্দের কোনো মুখরোচক খাবারের খোঁজ শুরু হয়। ক্ষুধা না থাকলেও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় অনেকের। প্রশ্ন হলো, পেট ভরা থাকার পরও কেন রাতে খাবারের প্রতি এ টান বাড়ে?

এর পেছনে রয়েছে শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ, হরমোনের কার্যক্রম, খাবারের ধরন ও দীর্ঘদিনের অভ্যাস। গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের অন্য সময়ের তুলনায় সন্ধ্যা ও রাতে মানুষের ক্ষুধা স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে পারে। যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও শক্তি বিপাকবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক জেমস বেটসের মতে, দিনের শেষভাগে ক্ষুধা উদ্রেককারী হরমোন ঘ্রেলিনের মাত্রা তুলনামূলক বেড়ে যায়। এ হরমোন মস্তিষ্ককে খাবারের প্রয়োজনীয়তার সংকেত দেয়।

14acab38b3968ecf4a83e2f99fef3b43

তবে রাতের ক্ষুধার পেছনে শুধু হরমোন দায়ী নয়। দিনের খাবারের ধরনও এতে প্রভাব ফেলে। প্রোটিন, আঁশ ও পানিসমৃদ্ধ খাবার দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। বিপরীতে, রাতের খাবারে এসব উপাদানের ঘাটতি থাকলে কিছুক্ষণ পর আবার ক্ষুধা অনুভূত হয়। পর্যাপ্ত পুষ্টি ও তৃপ্তি না পাওয়া খাবারের পর শরীর দ্রুত ক্ষুধার সংকেত দিতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘদিনের অভ্যাস। বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুধা ও খাদ্যাভ্যাসবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক সুজান হিগসের মতে, বারবার নাশতা করার অভ্যাস তৈরি হলে সেই পরিবেশই পরে খাবারের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতে পারে। যেমন, টেলিভিশন দেখতে দেখতে নিয়মিত কিছু খাওয়ার অভ্যাস থাকলে টিভি চালু করলেই খাবারের কথা মনে হতে পারে। পেট ভরা থাকলেও ঘুমানোর আগে কিছু খেয়ে নেয়ার প্রবণতাও এ ধরনের অভ্যাসের অংশ।

Eating-before-bed.-What-to-eat-and-what-not-to-eat-before-going-to-sleep

রাতে শুধু ক্ষুধাই বাড়ে না, চর্বি ও ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবারের প্রতিও আকর্ষণ তীব্র হয়। এ ধরনের খাবার মস্তিষ্ককে আনন্দ ও তৃপ্তির অনুভূতি দেয়। ফলে পেট ভরা থাকলেও মিষ্টি, চকলেট কিংবা ভাজাপোড়া খাবার খেতে ইচ্ছে করে। যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় ও কানাডার ইউনিভার্সিটি অব মনকটনে কর্মরত পুষ্টিবিদ ড. ক্রিস্টিন বিউলিউয়ের মতে, দিনের শেষভাগে কম চর্বিযুক্ত খাবারের তুলনায় বেশি চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়তে পারে। খাবারের প্রতি এ আনন্দনির্ভর আকাঙ্ক্ষা অনেক সময় পেট ভরে যাওয়ার সংকেতকেও ছাপিয়ে যায়। তাই রাত ৯টার দিকে বিস্কুটের কৌটার সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়াকে সব সময় ইচ্ছাশক্তির অভাব বলা যায় না। এর সঙ্গে শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়াও জড়িত।

P7B7Y7NNYBIBHLIPZ4RPTU76ZU

রাতে খাবারের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ঘুমের সম্পর্কও রয়েছে। কিছু গবেষণায় পরিশোধিত শর্করা ও বাড়তি চিনিযুক্ত খাবারের সঙ্গে ঘুমের মান খারাপ হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। সাদা পাউরুটি, সাদা ভাত, বিস্কুট ও কেকের মতো খাবার রক্তে শর্করার মাত্রায় দ্রুত ওঠানামা ঘটাতে পারে। অন্যদিকে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা বাড়তে পারে এবং বেশি ক্যালরি ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হতে পারে। তবে খাবার ও ঘুমের মধ্যে কোনটি আগে প্রভাব ফেলছে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। অর্থাৎ মিষ্টি খাবার খাওয়ার কারণে ঘুমের সমস্যা হচ্ছে, নাকি ঘুম কম হওয়ার কারণে মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে—তা সব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে বলা যায় না।

বিবিসি অবলম্বনে