তুরস্কের মধ্য আনাতোলিয়া অঞ্চলের ক্যাপাডোকিয়া যেন প্রকৃতি ও মানবসভ্যতার যৌথ সৃষ্ট এক বিস্ময়কর ভূখণ্ড। ভূমধ্যসাগরীয় গ্রামের সৌন্দর্য, সবুজ মালভূমি আর সুউচ্চ পর্বতমালার ভিড়ে এ অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি একেবারেই আলাদা। অদ্ভুত আকৃতির পাথুরে স্তম্ভ, বিস্তীর্ণ উপত্যকা আর মাটির নিচে গড়ে ওঠা প্রাচীন শহর—সব মিলিয়ে ক্যাপাডোকিয়াকে বলা হয় ‘রূপকথার দেশ’। এখানকার বিভিন্ন আকারের শত শত ‘ফেয়ারি চিমনি’ যেন সূর্য ও চাঁদকে অভিবাদন জানায়। অন্যদিকে, ভূগর্ভস্থ গুহা ও রহস্যময় সুড়ঙ্গগুলো বহন করে চলেছে হাজার বছরের ইতিহাস।

ফার্সি ভাষায় ‘ক্যাপাডোকিয়া’ নামের অর্থ ‘সুন্দর ঘোড়ার দেশ’। তুরস্কের মধ্য আনাতোলিয়ায় অবস্থিত এ অঞ্চল আকসারায়, নেভশেহির, নিগদে, কায়সেরি ও কিরশেহির প্রদেশের বিভিন্ন অংশজুড়ে বিস্তৃত। প্রাচীনকাল থেকেই নানা সভ্যতার মানুষের বসতি ছিল এখানে। পাথর কেটে তৈরি গির্জা, মঠ ও ভূগর্ভস্থ শহরে এখনো সেই সভ্যতাগুলোর নিদর্শন পাওয়া যায়।

Horses-in-Cappadocia-1777889936

ক্যাপাডোকিয়ার অদ্ভুত ভূপ্রকৃতির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস। লক্ষ লক্ষ বছর আগে আশপাশের সক্রিয় আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত লাভা ও পুরু আগ্নেয় ছাইয়ে ঢেকে যায় বিস্তীর্ণ অঞ্চল। সময়ের সঙ্গে এসব উপাদান জমাট বেঁধে তৈরি হয় নরম আগ্নেয়শিলা, যা ‘টাফ’ নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে বাতাস ও পানির প্রবাহে এই শিলার ক্ষয় হতে থাকে। নরম ও শক্ত শিলার ভিন্ন ভিন্ন ক্ষয়ের ফলে তৈরি হয় বিচিত্র আকৃতির শঙ্কু, স্তম্ভ, চূড়া ও চিমনি। এগুলোই পরিচিতি পেয়েছে ‘ফেয়ারি চিমনি’ নামে।

প্রকৃতির তৈরি নরম পাথুরে ভূখণ্ডকে কাজে লাগিয়েছিল মানুষও। পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছিল বসতি, উপাসনালয়, আস্তাবল ও খাবার সংরক্ষণের কক্ষ। কোথাও কোথাও এসব স্থাপনা মাটির নিচে আট তলা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গড়ে তুলেছে বিশাল ভূগর্ভস্থ শহর। মানুষের তৈরি এসব কক্ষ ও সুড়ঙ্গ ক্যাপাডোকিয়ার ভূদৃশ্যকে দিয়েছে অনন্য স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য।

এ অঞ্চলে ৩০টির বেশি ভূগর্ভস্থ শহরের সন্ধান পাওয়া গেছে। নতুন নতুন স্থাপনার সন্ধানও মিলছে। ধারণা করা হয়, নরম আগ্নেয়শিলায় বসবাসের উপযোগী স্থান তৈরি করে এসব শহরের গোড়াপত্তন করেছিল ফ্রিজিয়ানরা। পরবর্তী সময়ে রোমান ও বাইজেন্টাইন যুগে এগুলোর বিস্তার ঘটে। যুক্ত হয় গির্জাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা। ইতিহাসের নানা সংকটময় সময়ে এসব ভূগর্ভস্থ শহর হাজার হাজার মানুষকে বাইরের আক্রমণ থেকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিল।

Lebanon-Israel-Iran-War-standard-1778155606

ক্যাপাডোকিয়ার বিভিন্ন জনপদ ও উপত্যকায় ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, স্থাপত্য ও প্রকৃতির অনন্য নিদর্শন। উচিসার, গোরেমে, আভানোস, উরগুপ, চাভুশিন, দেরিনকুয়ু, কায়মাকলি ও ইহলারা উপত্যকা এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য পর্যটন আকর্ষণ।

নেভশেহির থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উচিসার। এখানকার বিখ্যাত ‘উচিসার রক ক্যাসেল’ বা পাথুরে দুর্গের ওপর থেকে দেখা যায় আশপাশের বিস্তীর্ণ উপত্যকা। শহরের কেন্দ্র ঘুরে কাছেই যাওয়া যায় ‘পিজিয়ন ভ্যালি’ বা ঘুঘুর উপত্যকায়। পাথরের গায়ে খোদাই করা পায়রার বাসা, সুড়ঙ্গ ও অষ্টম-নবম শতকের গির্জা রয়েছে এখানে। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এ পথ হাইকিংয়ের জন্যও জনপ্রিয়।

উচিসার থেকে গোরেমের পথে এগোলে দেখা মিলবে ক্যাপাডোকিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক জনপদের। ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত মঠভিত্তিক ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্র ছিল গোরেমে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ গোরেমে ওপেন-এয়ার মিউজিয়ামে রয়েছে পাথর কেটে তৈরি গির্জা, মঠ ও বসতি। এসব স্থাপনার দেয়ালে আঁকা ফ্রেস্কো ও ম্যুরালে ফুটে উঠেছে প্রাচীন খ্রিস্টীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জীবনের নানা দিক। এখানকার সবচেয়ে নতুন ম্যুরালগুলোর কয়েকটি দ্বাদশ শতকের।

ক্যাপাডোকিয়ার অন্যতম প্রাচীন জনপদ আভানোস। লাল মাটির বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে হিটাইট আমল থেকেই এটি মৃৎশিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় কর্মশালাগুলোয় কারুশিল্পীদের মাটির পাত্র তৈরির কাজ দেখতে পারেন দর্শনার্থীরা। চাইলে বিশেষজ্ঞের সহায়তায় নিজেরাও পাত্র তৈরির অভিজ্ঞতা নিতে পারেন।

পাথর কেটে তৈরি বাড়িঘরের জন্য পরিচিত চাভুশিন গ্রামও ঘুরে দেখার মতো জায়গা। আর সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করতে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে কিজিলচুকুর উপত্যকা। দিনের শেষ আলোয় উপত্যকার পাথুরে গায়ে লালচে আভা ছড়িয়ে পড়লে বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট।

images

ক্যাপাডোকিয়ার বড় জনপদগুলোর একটি উরগুপ। নেভশেহির থেকে প্রায় ১৫ মিনিটের দূরত্বের এ শহরকে চেনা যায় এর তিনটি বিখ্যাত ফেয়ারি চিমনি দিয়ে। আশপাশের দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার জন্যও এটি ভালো কেন্দ্র। এখানে রয়েছে বিলাসবহুল বুটিক হোটেল ও স্থানীয় বাজার। বাজারে হাতে বোনা কাপড় থেকে শুরু করে ফেয়ারি চিমনির ছোট প্রতিরূপসহ নানা ধরনের স্মারকসামগ্রী পাওয়া যায়। স্থানীয় খাবারের মধ্যে ‘টেস্টি কাবাব’ ও ‘সাচ কাভুরমা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ভূগর্ভস্থ শহর দেখতে চাইলে যেতে হবে কায়মাকলি ও দেরিনকুয়ুতে। কায়মাকলি ক্যাসলের নিচে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ শহরটি মাটির আট স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত। এর প্রথম স্তর ব্যবহৃত হতো আস্তাবল হিসেবে। অন্য স্তরগুলোতে রয়েছে বসবাসের কক্ষ, গির্জা ও সমাধিস্থল। কায়মাকলি থেকে প্রায় নয় কিলোমিটার দূরে দেরিনকুয়ু। তুর্কি ভাষায় ‘দেরিনকুয়ু’ শব্দের অর্থ গভীর কূপ। এখানকার পানির কূপ থেকেই শহরটির নামের উৎপত্তি। সাত স্তরে বিস্তৃত এ ভূগর্ভস্থ শহরে রয়েছে আস্তাবল, খাবার সংরক্ষণের কক্ষ, ভোজনকক্ষ, গির্জা ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় স্থাপনা।

নেভশেহির থেকে আকসারায়ের পথে গেলে দেখা মিলবে ইহলারা উপত্যকার। মেলেনদিজ নদীর প্রবাহে তৈরি এ গভীর গিরিখাত প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। প্রাচীনকালে ‘পেরিস্ত্রেমা’ নামে পরিচিত উপত্যকাটি ছিল বাইজেন্টাইন সন্ন্যাসীদের প্রিয় নির্জন আশ্রয়। এখানে পাথর কেটে তৈরি শতাধিক গির্জা রয়েছে। প্রায় ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ হাঁটার পথ ধরে উপত্যকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক স্থাপনা কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে।

ক্যাপাডোকিয়া ভ্রমণ শুধু দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এখানকার ভূপ্রকৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। প্রাচীন মানুষের বসবাসের জন্য পাথর কেটে তৈরি করা অনেক গুহাকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বুটিক হোটেলে রূপ দেয়া হয়েছে। এসব হোটেলে থাকার মাধ্যমে একদিকে যেমন পাওয়া যায় ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের স্বাদ, অন্যদিকে মেলে আধুনিক আতিথেয়তা।

ঘোড়ার পিঠে উপত্যকা ঘুরে দেখাও এখানকার জনপ্রিয় আয়োজন। ‘সুন্দর ঘোড়ার দেশ’ হিসেবে পরিচিত ক্যাপাডোকিয়ায় ঘোড়ায় চড়ে পাথুরে পথ ও উপত্যকা ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে। প্রতিদিনের স্বল্প সময়ের ভ্রমণের পাশাপাশি কয়েক দিনের ঘোড়সওয়ারি আয়োজনও রয়েছে। পূর্ণিমার রাতে উপত্যকার পথ ধরে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতাও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

Screenshot 2026-11-03 182632

মাউন্টেন বাইকিংয়ের জন্যও ক্যাপাডোকিয়া দারুণ জায়গা। পাথুরে উপত্যকা, আঙুর ও ফলের বাগান, প্রাচীন গুহাবাড়ি আর আঁকাবাঁকা মাটির পথ ধরে বাইক চালানোর সুযোগ রয়েছে। উরগুপ-ওর্তাহিসার কিংবা উরগুপ-আভানোস-উচিসার পথে যেতে যেতে দেখা মেলে বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক দৃশ্য ও ঐতিহাসিক জনপদের। গোরেমে ও ঘুঘুর উপত্যকার আশপাশের পথগুলোও বাইক চালানোর জন্য জনপ্রিয়।

হাইকিংপ্রেমীদের জন্যও রয়েছে নানা পথ। ঘুঘুর উপত্যকা, আশ্ক উপত্যকা, গুল্লুদেরে উপত্যকা ও কিলিচলার উপত্যকা কয়েক ঘণ্টার হাঁটায় ঘুরে দেখা যায়। আর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে চাইলে ইহলারা উপত্যকার ১৪ কিলোমিটারের ট্রেইল হতে পারে ভালো পছন্দ।

তবে ক্যাপাডোকিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে হট এয়ার বেলুনে চড়ে সূর্যোদয় দেখা। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলে রঙিন বেলুনগুলো একে একে আকাশে ভেসে ওঠে। ওপর থেকে দেখা যায় ফেয়ারি চিমনি, পাথুরে উপত্যকা ও বিস্তীর্ণ জনপদের অপূর্ব দৃশ্য। মাটি থেকে দেখা ক্যাপাডোকিয়ার সৌন্দর্য আকাশ থেকে যেন আরও বিস্তৃত হয়ে ধরা দেয়। প্রকৃতির দীর্ঘ সময়ের নির্মাণ আর মানুষের হাতে গড়ে ওঠা ইতিহাসের এমন মেলবন্ধনই ক্যাপাডোকিয়াকে করে তুলেছে বিশ্বের অন্যতম অনন্য পর্যটন গন্তব্য।

আল জাজিরা থেকে অনূদিত