শুরু করা যাক একজন প্রফেসরের প্রতিদিনের রুটিন নিয়ে ... প্রত্যেকদিন রাত ১০টার দিকে ঘুমাতে যান প্রফেসার অ্যামি পিউ বার্নার্ড। ভোর সাড়ে ৪টার মধ্যেই ঘুম ভেঙে যায় তার। এরপর আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারেন না। কখনো ঘুম আসতে দেরি হলে পাঁচ ঘণ্টারও কম ঘুম হয়। কিন্তু পরদিনও ক্লান্তি অনুভব করেন না তিনি। সকালে পোষা কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে যান, এক ঘণ্টা ব্যায়াম করেন, এমনকি সকাল ৮টার আগেই দেড় ঘণ্টার কাজও সেরে ফেলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের রোগপ্রতিরোধবিদ্যার এই প্রফেসরের কাছে এতো স্বল্প ঘুমেও স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়া নমিত্তিক ব্যাপার। তার বাবা ও ভাইয়েরও ঘুমের প্রয়োজন অন্য মানুষের তুলনায় কম।

তবে এ ধরণের মানুষ খুবই বিরল। সাধারণভাবে ২৬ থেকে ৬৪ বছর বয়সী একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। তাহলে কেউ কেউ এত কম ঘুমিয়েও কীভাবে স্বাভাবিক থাকেন? সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গবেষকরা এর পেছনে জিনগত বৈশিষ্ট্যের ভূমিকা খুঁজে পেয়েছেন।

২০১৯ সালে বার্নার্ড জানতে পারেন, তার কম ঘুমের পেছনে রয়েছে একটি বিশেষ জিনগত পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকোর গবেষকরা এমন একটি পরিবর্তন শনাক্ত করেছিলেন, যার বাহকরা সাধারণ সময়েই ঘুমাতে যান, কিন্তু ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়েন। তাদের ঘুমের সময় হয় সাধারণত ৪ থেকে সাড়ে ৬ ঘণ্টা।

রক্তের নমুনা পরীক্ষার পর বার্নার্ড জানতে পারেন, তিনিও এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে বলা হয় ‘ফ্যামিলিয়াল ন্যাচারাল শর্ট স্লিপ’ (এফএনএসএস)। এটি বংশগত একটি বিরল বৈশিষ্ট্য। পরবর্তী সময়ে এ ধরনের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত আরো কয়েকটি জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত হয়েছে।

২০১৪ সালে এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় যমজ দুই ভাইয়ের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। তাদের একজনের শরীরে কম ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত পরিবর্তন ছিল, অন্যজনের ছিল না। দেখা যায়, জিনগত পরিবর্তন থাকা ভাইটি নিয়মিত অন্য ভাইয়ের তুলনায় প্রায় ১ ঘণ্টা কম ঘুমাতেন। দুজনকে টানা ৩৮ ঘণ্টা জাগিয়ে রাখার পর পরীক্ষায় তার কর্মক্ষমতায় ভুলের পরিমাণ অন্য ভাইয়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম ছিল।

গবেষকেরা আরো দেখেন, কম ঘুমানো ভাইটির নন-র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট (নন-আরইএম) ঘুমের পরিমাণ প্রায় একই ছিল। এ পর্যায়ের ঘুমের মধ্যে গভীর ঘুমও রয়েছে। অর্থাৎ কম সময় ঘুমিয়েও তিনি ঘুমের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা বেশি মাত্রায় পেতে পারেন।

সব কম ঘুমের মানুষ অবশ্য সুস্থ নন

অল্প ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে ওষুধশিল্পেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এসব গবেষণার ফল ঘুমের সমস্যা চিকিৎসায় নতুন ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগতে পারে। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের কম ঘুমিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এমন ওষুধ ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে এ ধরনের ওষুধ তৈরির আগে জিনগত পরিবর্তনগুলো কীভাবে কাজ করে, তা ভালোভাবে বুঝতে হবে বলে মনে করেন গবেষক ইং-হুই ফু। তিনি বলছেন, অল্প ঘুমের সুবিধা দিতে গিয়ে এমন কোনো ওষুধ তৈরি করা ঠিক হবে না, যার কারণে কয়েক বছর পর আলঝেইমার, পারকিনসন বা ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের ঘুমের সময়ের পার্থক্যের ৩০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে হতে পারে। এখন পর্যন্ত ঘুমের সময়কে প্রভাবিত করে এমন কয়েক’শ জিনগত অংশ শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য নিয়ে করা একটি নতুন বিশ্লেষণে এমন ২৪৪টি জিনগত অংশের সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক গবেষণাপত্র হিসেবে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।

নিজেকে সুস্থ মনে হলেই কি ঘুম যথেষ্ট?

অল্প ঘুমিয়েও যারা নিজেদের স্বাভাবিক মনে করেন, তারাও সব সময় নিজের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার সঠিক বিচার করতে পারেন না। ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির ঘুম ও কর্মক্ষমতা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানী হ্যান্স ভ্যান ডংগেন বলেন, ঘুমের ঘাটতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের কর্মক্ষমতা কমতে থাকে।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে জিনগত গবেষণার মাধ্যমে কারা সত্যিই কম ঘুমিয়েও সুস্থ থাকতে পারেন, তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে যারা নিজেদের স্বাভাবিক মনে করলেও ঘুমের ঘাটতির কারণে ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাদেরও আলাদা করা যাবে।

বার্নার্ডের জন্য নিজের জিনগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানা ছিল স্বস্তির। তিনি আগে থেকেই জানতেন, মানুষের ঘুমের প্রয়োজন এক রকম নয়। অল্প ঘুমের কারণে দিনের কাজ অন্যদের আগে শুরু করার বাড়তি সময়ও পেতেন তিনি।

তবু কখনো তার মনে প্রশ্ন জাগত, তিনি কি ঠিকমতো বিশ্রাম নিতে পারেন না, নাকি অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণেই বেশি ঘুমাতে পারেন না? জিনগত পরীক্ষার ফল জানার পর সেই সংশয় কেটে গেছে। এখন তিনি জানেন, অল্প ঘুমের অভ্যাস তার জিনগত বৈশিষ্ট্যের অংশ। তাই নিজের এই স্বাভাবিক ছন্দ মেনেই জীবন কাটাতে চান তিনি।

—বিবিসি