অফিসের সাপ্তাহিক মিটিং— আলোচনার বিষয়বস্তু জানা, কোন জায়গায় সমস্যা হচ্ছে, কীভাবে কাজ আরো ভালো করা যায়, সে সম্পর্কেও মাথায় কিছু ধারণা আছে। কিন্তু কথা বলার সুযোগ আসতেই মনে হয়, এখন বলব নাকি আরেকটু অপেক্ষা করব? অন্যরা কী ভাববেন, বক্তব্যে ভুল হলে কী হবে—এমন নানা চিন্তায় শেষ পর্যন্ত আর বলা হয় না। মিটিং শেষ হওয়ার পর মনে হয়, বলতে চাওয়া কথাটিই হয়তো আলোচনার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ছিল।

কর্মক্ষেত্রে এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই। বিশেষ করে করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক মিটিংয়ে নিজের মতামত তুলে ধরার সুযোগ থাকলেও অনেকে নীরব থাকেন। অথচ তাদের বলার মতো অনেক কথাই থাকে। আর তা প্রকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায় মানসিক অস্বস্তি, ভুল করার ভয় ও অন্যের মূল্যায়ন নিয়ে দুশ্চিন্তা। জনপ্রিয় স্পিকিং কোচ ও লেখক অ্যান্ডি ও’সুলিভানের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮৯ শতাংশ পেশাজীবী মিটিংয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠায় ভোগেন। এমনকি প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও এ অভিজ্ঞতার বাইরে নন।

কথা বলতে গিয়ে কেন আটকে যান

মিটিংয়ে নীরব থাকার অন্যতম কারণ অন্যের কাছে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করবেন, সেই উদ্বেগ। সহকর্মীদের সামনে ভুল কিছু বলে ফেললে নিজের গ্রহণযোগ্যতা কমে যাবে কিনা, ঊর্ধ্বতনরা নেতিবাচকভাবে নেবেন কিনা কিংবা বক্তব্যটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে কিনা—এসব চিন্তা অনেককে পিছিয়ে দেয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ইভালুয়েশন অ্যাপ্রিহেনশন’ বা অন্যের মূল্যায়ন নিয়ে ভয়।

এ কারণে অনেকেই সহকর্মীদের সঙ্গে একান্ত আলোচনায় স্বচ্ছন্দ থাকলেও মিটিংয়ে কথা বলতে পারেন না। উপস্থিত মানুষের সংখ্যা যত বাড়ে, ততই নিজের বক্তব্য নিয়ে সংশয় তৈরি হতে থাকে। আবার সভায় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা উপস্থিত থাকলে ভুল করার ঝুঁকি অনেক বেশি বলে মনে হয়। ফলে নিজের জানা বিষয় নিয়েও কথা বলার সাহস হারিয়ে ফেলেন কেউ কেউ।

তবে দীর্ঘদিন এমন নীরবতা পেশাগত অগ্রগতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। কাজের দক্ষতা থাকলেও মিটিংয়ে নিজের চিন্তা ও অবদান তুলে ধরতে না পারলে তা নীতিনির্ধারকদের নজরে কম আসতে পারে। ম্যাককিনসির এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ২৬ শতাংশ টিম লিডার এমন পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে কর্মীরা নির্দ্বিধায় নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন।

office_meeting1

ছোট প্রস্তুতিতে কাটতে পারে জড়তা

মিটিংয়ে কথা বলার অভ্যাস তৈরির কাজ শুরু করতে হবে সভার আগেই। আলোচ্য বিষয় জানা থাকলে নিজের কাজের অগ্রগতি, সম্ভাব্য সমস্যা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তাবগুলো ছোট করে লিখে রাখতে পারেন। পুরো বক্তব্য মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। কয়েকটি মূল পয়েন্ট জানা থাকলেই আলোচনায় অংশ নেয়া সহজ হয়।

মিটিং শুরু হওয়ার প্রথম ১০ মিনিটের মধ্যে অন্তত একবার কথা বলার চেষ্টা করুন। সেটি বড় কোনো বক্তব্য হতে হবে না। নিজের কাজের অগ্রগতি জানানো, প্রয়োজনীয় তথ্য যোগ করা কিংবা একটি প্রশ্ন করাও যথেষ্ট। শুরুতেই একবার কথা বলতে পারলে পরবর্তী সময়ে আলোচনায় যুক্ত হওয়ার জড়তা অনেকটাই কমতে পারে।

কথা বলার সময় বক্তব্য নিখুঁত করার চেষ্টায় বেশি সময় নষ্ট করবেন না। প্রথমে মূল বিষয়টি তুলে ধরুন, এরপর প্রয়োজনীয় তথ্য বা অভিজ্ঞতা দিয়ে যুক্তি দিন। সবশেষে কী করা যেতে পারে, সে বিষয়ে প্রস্তাব রাখুন। অন্য কারো বক্তব্যের সূত্র ধরেও নিজের মতামত জানাতে পারেন। সব সময় নতুন কোনো ধারণা দিতে হবে, এমন নয়। ভালো প্রশ্ন করা কিংবা আলোচনার কোনো অস্পষ্ট বিষয় পরিষ্কার করাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

ভুলের ভয় কাটিয়ে নিজের কথা বলুন

মিটিংয়ে কথা বলতে গিয়ে হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, মুখ লাল হয়ে যাওয়া কিংবা কণ্ঠস্বর কেঁপে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রথমে নিজের অস্বস্তি বুঝতে হবে। এরপর পা মেঝেতে স্থির রেখে, কাঁধ শিথিল করে সোজা হয়ে বসুন। এতে শারীরিক অস্থিরতা সামলে আলোচনায় মনোযোগ ফেরানো সহজ হতে পারে।

আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, নিজের ভুলকে আমরা অনেক সময় অন্যদের তুলনায় বেশি বড় করে দেখি। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘স্পটলাইট ইফেক্ট’। তাই কোনো বক্তব্যে ভুল হলে অস্বস্তিতে থেমে না গিয়ে প্রয়োজনমতো সংশোধন করে আলোচনা চালিয়ে যাওয়াই ভালো।

মিটিংয়ে ভালো করার অর্থ সবচেয়ে বেশি কথা বলা নয়। বরং প্রয়োজনের সময় নিজের চিন্তা, মতামত ও প্রশ্ন স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি সভায় অন্তত একবার কথা বলার ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। নিয়মিত চর্চায় ধীরে ধীরে জড়তা কমবে। কারণ, কাজ জানা যেমন পেশাগত দক্ষতার অংশ, তেমনি সেই কাজের অভিজ্ঞতা ও চিন্তাভাবনা অন্যদের কাছে পৌঁছে দেয়ার সক্ষমতাও ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়ার জন্য জরুরি।

কনফিডেন্ট ইউ অবলম্বনে