পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য বান্দরবান ঘিরে পর্যটকদের আগ্রহের শেষ নেই। মেঘে ঘেরা পাহাড়ি এ অঞ্চলে রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে থানচি, রুমা ও রোয়াংছড়ির মতো দুর্গম অঞ্চলেও নতুন নতুন পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু সম্প্রতি পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) অশান্ত-ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করায় এসব উদ্যোগ ম্লান হতে বসেছে। আধিপত্য বিস্তারে তারা পাহাড়ে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলোতেও নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করছে। ঘটছে প্রাণহানি। এমন পরিস্থিতিতে বান্দরবানের পর্যটন সম্ভাবনা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

কেএনএফ মূলত বান্দরবানকেন্দ্রিক আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন। পার্বত্য তিন জেলার প্রায় অর্ধেক আয়তনের লামা, রুমা, আলীকদম, থানচি, রোয়াংছড়ি, বিলাইছড়ি, জুরাইছড়ি ও বরকলসহ আশপাশের এলাকা নিয়ে একটি মনগড়া মানচিত্র তৈরি করেছে কেএনএফ। প্রস্তাবিত মানচিত্রের তিনদিকে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্ত। পাহাড়ের বম, পাঙ্খুয়া, খুমি, ম্রো ও খিয়াং নামক ক্ষুদ্র ছয়টি জাতি-গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠন হয়েছে কেএনএফ। সংগঠনের লোগোতে প্রতিষ্ঠাকাল ২০০৮ সাল বলে উল্লেখ থাকলেও মূলত ২০১৮ সালের পর থেকে সশস্ত্র কাঠামোয় মাথাচাড়া দিতে থাকে। সর্বশেষ গত বছর অক্টোবর থেকে কুকিদের ভয়ংকর রূপ জনসমক্ষে আসে।

পাহাড়ি এলাকার অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বান্দরবানের থানচি সড়ক সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের এ উন্নয়নমূলক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে গত ১১ মার্চ কেএনএফ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত উন্নয়নকাজে নিযুক্ত ১২ শ্রমিককে অপহরণ করে। এদের মধ্যে একজন শ্রমিক গুলিবিদ্ধ হন। এছাড়া সাত শ্রমিককে মুক্তিপণের বিনিময়ে ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সড়ক নির্মাণকাজে আর না যাওয়ার শর্তে ছেড়ে দেয়। বাকিদের এখনো কেএনএফ জিম্মি করে রেখেছে বলে জানা যায়। 

১২ মার্চ দুপুরে বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে অতর্কিতে গুলিবর্ষণ করে টহলরত সেনাবাহিনীর এক সদস্যকে (মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিন) হত্যা ও দুজনকে আহত করে সন্ত্রাসীরা। তার আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি বান্দরবানের তিন উপজেলায় গাড়ি চলাচল বন্ধের জন্য পরিবহন মালিক সমিতিকে হুমকি দিয়ে নোটিস জারি করে কেএনএফ। যার মূল উদ্দেশ্য বান্দরবানকে পর্যটকশূন্য করা।

কেএনএফের তৎপরতা সম্পর্কে কথা বলতে রোয়াংছড়ির ইউএনও মো. খোরশেদ আলম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে সেলফোনে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। শুধু তিনিই নন, কেএনএফের বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না স্থানীয়রাও। নাম না প্রকাশের শর্তে তারা জানান, তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছিল উঁচু পাহাড়ের নৈসর্গিক বান্দরবানে। মেঘে ঘেরা এ পাহাড়ি অঞ্চলে রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়নের কারণে থানচি, রুমা ও রোয়াংছড়ির মতো দুর্গম অঞ্চলেও নতুন নতুন পাহাড়ি পর্যটন স্পট সবেই জমে উঠছিল। ঠিক তখনই কেএনএফ অশান্ত-ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে বান্দরবান তথা পার্বত্য অঞ্চলে।

জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়াকে অস্ত্র প্রশিক্ষণসহ সার্বিক মদদ দেয়া এ কেএনএফ এখন পাহাড়ের শান্তি-শৃঙ্খলার জন্য প্রধান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কথামতো না চললে নিজ সম্প্রদায় বা অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাসিন্দাদেরও রেহাই দিচ্ছে না তারা। 

পাহাড়ে শান্তি ফেরাতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন বান্দরবান দুর্নীতি কমিশনের জেলা সভাপতি অচমং মারমা। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌পাহাড়ে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির পেছনে মূলত কেএনএফসহ বেশ কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাধী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বান্দরবানের পর্যটন ও অর্থনীতির বিকাশের জন্য সবার আগে পাহাড়ে শান্তি ফেরাতে হবে। এই কাজটি সরকারকেই করতে হবে।’

রÅvGবর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফে বম সম্প্রদায়ের ২০০ সদস্য রয়েছে। প্রথমে তারা নিজেদের সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার জন্য সংগঠিত হওয়ার কথা বললেও পরে জঙ্গি প্রশিক্ষণ, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাদের এসব কার্যক্রম বান্দরবানের পর্যটন ও অর্থনীতির জন্য হুমকি।’

তিনি আরো বলেন, ‘কেএনএফ পাহাড়ের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নানা অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েক দফায় পাহাড়ে অভিযান চালানো হয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। নাথান বমসহ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন। তাদের ঘিরে র‍্যাবের নজরদারি রয়েছে। যারাই দেশের বিরুদ্ধে বা আইনের বিরুদ্ধে কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’