প্রকল্পের অনুমোদন মেলে, বিল ছাড়ও হয়।
কিন্তু বাস্তবে অগ্রগতি হয় না খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) উন্নয়ন প্রকল্পগুলোয়।
এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে খুলনা নগরীর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের তিন সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পেও।
একনেকে অনুমোদনের সাড়ে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও গতি পায়নি প্রকল্পটি।
নাগরিক নেতারা বলছেন, ১৯৬১ সালে খুলনার পরিকল্পিত উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে কেডিএ প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে নানা অনিয়মে জড়িয়ে সংস্থাটি খুলনার পরিকল্পিত উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছে।
সংস্থাটিতে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ মিললেও তা বাস্তবায়ন হয় না।
ব্যয় বাড়াতে প্রকল্প নিয়ে ফেলে রাখার কারসাজি চলে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, খুলনা নগরীর অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য তিনটি সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প ২০১৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদন পায়।
প্রায় ৩৯৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের কাজ ২০২১ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা।
অথচ সড়ক তিনটির জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণই এখনো হয়নি।
ফলে প্রকল্পটি যথাসময়ে বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
কেডিএর দেয়া তথ্যমতে, খুলনা নগরীর নিরালা আবাসিক এলাকা থেকে সরাসরি সিটি বাইপাস সড়কে সংযুক্ত হতে একটি, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রায়েরমহল পর্যন্ত একটি এবং দৌলতপুর কৃষি কলেজ (পুরাতন সাতক্ষীরা রোড) থেকে বাস্তুহারা পর্যন্ত আরেকটি সংযোগ সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে কেডিএ।
এর মধ্যে প্রথম সড়কটি নিরালা ১ নম্বর সড়ক হয়ে দীঘির পাশ দিয়ে সোজা বাইপাসে গিয়ে মিশবে।
সড়কটি হবে আড়াই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রায়েরমহল পর্যন্ত দ্বিতীয় সড়কটি ৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার এবং দৌলতপুর কৃষি কলেজ থেকে বাস্তুহারা পর্যন্ত তৃতীয় সড়কটি ২ দশমিক ৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের হওয়ার কথা।
কেডিএর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিন সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কাজ দেখাশোনার জন্য ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি পিকআপ কেনা হয়েছে, যা এখন অন্যকাজে ব্যবহার হচ্ছে।
এছাড়া রড পরীক্ষায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২ হাজার কেএন ক্ষমতার একটি ইউটিএম মেশিন কেনা হয়েছে, যা সংস্থাটির গ্যারেজে প্যাকেটবন্দি হয়ে পড়ে আছে।
জমি অধিগ্রহণের আগেই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কাজও সম্পন্ন হয়েছে।
এছাড়া প্রকল্পটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ ধরনের সড়ক সম্পর্কে ‘বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের’
জন্য এরই মধ্যে বিদেশ সফরও করেছেন।
কিন্তু এতকিছু হলেও মূল সড়ক নির্মাণকাজই এখনো শুরু করা যায়নি।
শুধুই অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সড়কের অ্যালাইনমেন্ট পরিবর্তনে তত্পরতা বেড়েছে।
তিন সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে নগরীর নিরালা এলাকার বাসিন্দা গাজী মিজানুর রহমান বলেন, শহর বড় হয়েছে।
এককালের ৪০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শহর বেড়ে এখন দ্বিগুণ অর্থাৎ ৮০ বর্গকিলোমিটার ছাড়িয়েছে এবং ক্রমেই তা আরো সম্প্রসারিত হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, এখন সহজে কম সময়ে শহরে প্রবেশে এ সড়কগুলোর বাস্তবায়ন জরুরি।
কিন্তু সড়কের জন্য নির্ধারিত জায়গায় কিছু দৃশ্যমান হচ্ছে না।
শুধু বছরখানেক আগে কেডিএর লোকজন এসে লাল পতাকা দিয়েছিল।
সেগুলোও কারা তুলে নিয়ে গেছে তাও কেউ জানে না।
মানুষ এ প্রকল্পের সুফল কবে পাবে?
প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির অভাব রয়েছে জানিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়ের অভাব, দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি একদম নেই।
পরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত, কিন্তু তা হচ্ছে না।
এসব প্রকল্পে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা উচিত জানিয়ে তিনি বলেন, একটি প্রকল্প তিন-চারবার করে মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হয় এবং বাড়তি এ টাকা জনগণ দেবে।
আর কিছু ঠিকাদার ও অসাধু কর্মকর্তা তা ভাগ করে খাবে, এতে অর্থের অপচয় হয়, জনগণের ভোগান্তি বাড়ে।
প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির কারসাজিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির মহাসচিব শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, সময়মতো কাজ না করায় শিপইয়ার্ডের মতো নতুন তিনটি সংযোগ সড়ক প্রকল্পেরও ব্যয় বাড়বে।
অতিরিক্ত এ টাকা জনগণেরই পকেট থেকে দিতে হবে।
এর পেছনে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণ জানতে চাইলে তিন সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মোর্তুজা আল-মামুন বলেন, তিনটি সড়কের মধ্যে দৌলতপুর কৃষি কলেজ থেকে বাস্তুহারা সড়কের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে ভূমি অধিগ্রহণ প্রস্তাব করা হয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রায়েরমহল সড়কেরও প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল।
কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে সংশোধনী দিয়েছে।
আগামী মাসে ফের পাঠানো হবে।
এছাড়া করোনার কারণেও অগ্রগতি কম।
আগামী বছরের শুরুতে কাজ শুরু করার কথা জানিয়ে কেডিএ চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুল ইসলাম বলেন, সড়কের প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের সমস্যা থাকে।
আমাদের তিনটি লিংকের মধ্যে একটি পরিষ্কার হয়েছে।
বাকি দুটির জন্য মন্ত্রণালয়ে কাজ চলছে।
সেটি শেষ হলেই আমরা জেলা প্রশাসকের কাছে জমি অধিগ্রহণের জন্য ফাইল দিয়ে দেব।
এরপর অর্থছাড়ের বিষয়টি রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পে মেয়াদ বৃদ্ধি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
তাছাড়া আমরা ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ করি।
আমরা বুঝি ব্যয় বৃদ্ধির চেয়ে জমিতে দাঁড়ানোটাই হলো বড় কথা।










