দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পেছনে মূখ্য কারণ হিসেবে কাজ করছে পারিবারিক আর্থিক অনটন, ইংরেজি ভাষার দুর্বলতা এবং গ্রাম-শহরের মধ্যকার সাংস্কৃতিক সংকট। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল বুধবার বিইউবিটির আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ।

২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২ হাজার ৩৮৯ জন শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ এবং ৪০টি কেস স্টাডির ভিত্তিতে গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিক্ষার্থীর পারিবারিক মাসিক আয় ৪০ হাজার টাকার ওপরে, উচ্চ সিজিপিএ রয়েছে এবং ক্যাম্পাসের ইতিবাচক পরিবেশ পান, তাদের পড়াশোনা মাঝপথে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম। বিপরীতে, গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবারের যেসব শিক্ষার্থী ইংরেজি ও গণিতে পিছিয়ে রয়েছে এবং গ্রাম-শহরের সামাজিক সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নিতে পারছে না, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তরের গড় আগ্রহ যেখানে ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ, সেখানে ভাষাগত ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় দ্বিগুণ, যা ৫৮ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত।

গবেষণায় শিক্ষার্থীদের অসন্তুষ্টির পেছনে একাডেমিক পরিবেশ, পরিকাঠামোর ঘাটতি, মনো-সামাজিক নিরাপত্তা এবং ক্যারিয়ার সহায়তার অভাবকে মূল উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া, শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রক্টরিয়াল বা সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সন্তোষ প্রকাশ করলেও গুণগত মানোন্নয়নে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করা, সিনিয়র শিক্ষকদের মেন্টরশিপ, সমৃদ্ধ ল্যাবরেটরি এবং উন্নত ক্যারিয়ার সেবার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করার কৌশলগত পরিকল্পনাটি শিক্ষার্থীদের মাঝে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

এ বহুমুখী সংকট সমাধানে গবেষক দল পাঁচ দফা সুপারিশ জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতে স্তরভিত্তিক আর্থিক সহায়তা বা বৃত্তির ব্যবস্থা করা, গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের ভাষাগত জড়তা কাটাতে বিশেষায়িত 'ইংরেজি ব্রিজ প্রোগ্রাম' চালু করা, সহপাঠীদের মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশ তৈরিতে 'পিয়ার মেন্টরশিপ' এবং স্কুল ও কলেজ পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যারিয়ার টিউটোরিয়াল সহায়তার ব্যবস্থা করা। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ আবাসন সংকটের কারণে ঝরে পড়ে বিধায়, মেস বা অনিরাপদ মেসের ঝুঁকি এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে ‘‌বিইউবিটি হাব’ নামে নিরাপদ ও মানসম্মত আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে।

প্রধান অতিথি ও ব্যবসায় ও অর্থনীতি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাসুদ হোসেন গবেষণাটিকে সময়োপযোগী বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রার প্রেক্ষাপটে গবেষণাটি সঠিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে বড় নীতি-সহায়তা হিসেবে কাজ করবে। অনুষ্ঠানের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার পাশাপাশি শিক্ষক ও অভিভাবকদের সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিবেদনটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে।