ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন আগামী এপ্রিলে আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ঘোষিত এ সময়টি নির্বাচনের জন্য সঠিক সময় বলে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। লন্ডনে চ্যাথাম হাউজের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স আয়োজিত এক আলাপচারিতায় গতকাল মূল বক্তা হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি এ কথা জানান।
চ্যাথাম হাউজের পরিচালক ব্রনওয়ে ম্যাডক্সের সঞ্চালনায় আলাপচারিতায় অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তাদের প্রধানত তিনটি দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল—সংস্কার, জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচার এবং নির্বাচন আয়োজন।
নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে বাংলাদেশে যে বিতর্ক চলছে, সে বিষয়টি সামনে এনে সঞ্চালক বলেন, সব মিলিয়ে অনেকে বলছেন—নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না। জবাবে ড. ইউনূস বলেন, এটা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর নির্বাচন। সময় (এপ্রিল) ঠিক আছে, জনগণও প্রস্তুত। ১৭ বছর পর আপনি একটি সত্যিকারের নির্বাচন পাচ্ছেন। দেশের মানুষের মনে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে যে তারা সত্যিই ভোট দিতে যাচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আগামী নির্বাচন একটি নতুন সরকার নির্বাচনের রুটিন ভোট হবে না, এটা হবে নতুন বাংলাদেশের জন্য ভোট। আমরা পুরনো বাংলাদেশকে বিদায় বলে নতুন বাংলাদেশ তৈরি করতে চাই।
দেশের তরুণদের স্বপ্ন ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, পরবর্তী নির্বাচন শুধু একটি নিয়মিত ভোট গ্রহণ বা নতুন সরকার নির্বাচনের জন্য নয়, বরং এটি হবে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার ভোট এবং এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি। গত ১৭ বছরে যারা নতুন ভোটার হয়েছে, তারা কেউ তাদের প্রথম ভোট দেয়ার সুযোগ পায়নি। ভোট দেয়ার প্রতি তরুণদের যে আগ্রহ, তা নতুন বাংলাদেশ গড়তে কাজে লাগানো হবে। আমরা তাদের স্বপ্ন ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করি...।
জাতির সামনে আগামী মাসে ‘জুলাই সনদ’ উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশ তৈরির জন্য সংস্কার কমিশন করা হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কমিশন তৈরি করেছি। আমরা তাদের সুপারিশের দিকে তাকিয়ে আছি। আমাদের কাজ হলো সব দলের ঐকমত্য তৈরি করা।
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত পরবর্তী সরকারের অংশ হতে ড. ইউনূস আগ্রহী বা সে ধরনের অবস্থানে রয়েছেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘কোনোভাবেই না, একেবারেই না। আমি মনে করি, আমাদের উপদেষ্টা পরিষদের কোনো সদস্যই সেটা করতে আগ্রহী হবেন না। আমাদের কাজ হলো সফল ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, যা নির্বাচনের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।’
নিজেদের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস আরো বলেন, আমাদের দায়িত্ব হলো যে রূপান্তর চলছে সেটা ঠিকমতো শেষ করা। আমরা চাই যখন নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করব, তখন জনগণ যেন সন্তুষ্ট থাকে। আর আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে নির্বাচনটি সঠিকভাবে সম্পন্ন হবে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
সংলাপে অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া বিভিন্ন কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আগে পাসপোর্টসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা পেতে ‘মাধ্যম’ প্রয়োজন হতো। এতে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হতো। এখন সরকারি বিভিন্ন সেবা অনলাইনের মাধ্যমে দেয়া হচ্ছে, যাতে সবাই সহজেই সেবা নিতে পারেন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে ড. ইউনূস বলেন, মার্কিন সরকার বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়ায় এখন রোহিঙ্গাদের ভরণ-পোষণ কারা দেবে? তাদের তো থাকার নির্দিষ্ট সময়ও নেই। বিষয়টি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গুরুত্ব সহকারে কাজ করছে। নারীদের অধিকার নিশ্চিতেও অন্তর্বর্তী সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার সময়কার অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ড. ইউনূস বলেন, ‘সেটি ছিল অত্যন্ত কঠিন সময়, যখন বিশ্ব নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল এবং বাংলাদেশও আলাদা ধরনের সংকটে ছিল। আমরা ছিলাম অর্থনীতির শূন্য পর্যায়ে, বরং ঋণাত্মক পর্যায়ে। আমাদের বিশাল দেনা পরিশোধ করতে হয়েছে।’
শেখ হাসিনার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রস্তুত করা শ্বেতপত্রের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিতাড়িত সরকারের সময়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। তখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল শূন্য এবং ব্যাংক খাত ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।’
দেশের অর্থনীতিকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রবাসী বাংলাদেশীদের অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে এবং আজ আমাদের ব্যালান্স অব পেমেন্ট পুরোপুরি পাল্টে গেছে।’ তার সরকারের প্রতি বৈশ্বিক সমর্থন প্রসঙ্গে ড. ইউনূস বলেন, সব দেশ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি নৈতিক সমর্থন দিয়েছে। এজন্য তিনি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়নি উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশের নিরাপত্তা, দেশের রাজনীতির নিরাপত্তার স্বার্থে নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। এটুকুই আমরা করেছি। আমরা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করিনি। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে একটি সুরক্ষিত বাড়িতে আছেন উল্লেখ করে সঞ্চালক প্রশ্ন করেন, বিচারের বিষয়টি কেন পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য ছেড়ে দেয়া হচ্ছে না? কেন অন্তর্বর্তী সরকার এটা নিয়ে কাজ করবে? জবাবে ড. ইউনূস বলেন, আমি এ সিদ্ধান্ত নিইনি। যারা আমাদের দায়িত্ব নিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, তারাই আমাদের এ কাজটি দিয়েছে। দায়িত্ব, তিনটি কাজ এবং আমরা সেই তিনটি কাজ গ্রহণ করেছি এবং আমরা কেবল সেটিই করছি।
এর আগে ড. ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন লন্ডনের প্রভাবশালী নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রামের পরিচালক বেন ব্ল্যান্ড এবং দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. চিয়েটিজ বাজপাই। পরে বেলা ১১টায় প্রধান উপদেষ্টা চ্যাথাম হাউজে আয়োজিত নীতি সংলাপে মূল বক্তা হিসেবে অংশ নেন। চ্যাথাম হাউজের মূল হল কক্ষে অনুষ্ঠিত এ সংলাপে ব্রিটিশ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিক, গবেষক এবং সংবাদমাধ্যম কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।










