নগর ভবনের পেছনে জীর্ণ পাকা ভবন ভেঙে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী হকারদের জন্য জায়গা করে দেন। এর আগ পর্যন্ত তারা সড়কে ব্যবসা করতেন। হকারদের জন্য এখানে রয়েছে আলাদা শেড। কিন্তু এত ব্যবস্থা থাকার পরও অল্প কয়েকটি দোকান সেখানে বসে। বাকি সব হকার আগের মতোই সড়কে চলে এসেছে। প্রতিদিন তারা সড়কে বসে থাকে তাদের পসরা সাজিয়ে। ফলে হকারদের পুনর্বাসনের জন্য নগরীর লালদীঘির পাড়ে বিশাল হকার্স মার্কেট অনেকটা খালি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের বিদায়ী মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বরাবরই নগরীতে যানজট ও হকারমুক্ত রাখতে সোচ্চার ছিলেন। আগামী নভেম্বরে তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তবে সিটি নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় কিছুটা ঢিল দিয়েছিলেন তিনি। এ সুযোগে আবার নগরীর রাস্তাঘাট চলে গেছে হকারদের দখলে। ফলে নগরীর প্রধান সড়কগুলোয় দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে নগরবাসী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আরিফুল হক চৌধুরীর অন্যতম পদক্ষেপ ছিল হকার পুনর্বাসন। সে লক্ষ্যে তিনি নগর ভবনের ঠিক পেছনে নগরীর লালদীঘির পাড়ে বিশাল হকার্স মার্কেটের জন্য জায়গা করে দিয়েছিলেন। অনেকেই সেখানে দোকান বরাদ্দ পেয়ে ব্যবসাও শুরু করে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে সিলেট সিটি করপোরেশনের রাস্তায় হকার উচ্ছেদ অভিযান জোরদার করা হয়। মেয়র আরিফের নেতৃত্বে প্রায় প্রতিদিন চলা এ অভিযান নগরবাসীর প্রশংসা কুড়ায়। সম্প্রতি সিটি নির্বাচনকালীন নমনীয়তার সুযোগে ফের হকাররা ফুটপাত ছাড়িয়ে রাস্তার অর্ধেক পর্যন্ত দখল করে বসে।
সরজমিনে দেখা গেছে, নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক থেকে ছোট সড়ক ও পাড়া-মহল্লায়ও ছড়িয়ে পড়েছে হকারদের বিস্তৃতি। সিলেট যেন হয়ে উঠেছে হকারময় এক নগরী। প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজারের ফুটপাতও হকারদের দখলে চলে গেছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সমানভাবে হকারদের উপস্থিতি চোখে পড়বে।
রফিকুল ইসলাম নামের এক হকার বলেন, ‘পুলিশকে সামান্য দিলেই হয়। সুযোগ দিচ্ছে, এজন্য সড়কে বসে আম বিক্রি করছি। পুলিশ বা মেয়র আরিফ কঠোর হলে আমরা থাকব না।’
শফিক মিয়া নামে এক হকার জানান, তার বাড়ি রংপুরে। তিনি মূলত টাওয়াল বিক্রি করেন। ভ্যানে করে টাওয়াল ও শিশুদের পোশাক বিক্রি করেন। জিন্দাবাজারে দাঁড়িয়ে কীভাবে ব্যবসা করছেন জানতে চাইলে বলেন, ‘দোকানের মালিকরা ডিস্টার্ব করলে তাদের কিছু দিয়ে দিই। আর পুলিশ তো নিয়মিত নেয়, এজন্য কিছু হয় না।’
লালদীঘির পাড়ে হকার্স মার্কেটে কথা হয় ব্যবসায়ী আরমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বয়স হয়ে গেছে, এজন্য রাস্তায় গিয়ে ব্যবসা করতে পারি না। অন্যরা চলে গেছে, তবু আমি বরাদ্দ পাওয়া দোকানে বসে আছি। ভবিষ্যতে যাতে আমার দোকানটা (ভিটা) হাতছাড়া না হয়।’
সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান রিপন বলেন, ‘মহানগরীর রাস্তার দুপাশ এখন হকারদের দখলে। হকাররা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ফুটপাত ও রাস্তা দখল করে ব্যবসা করে যাচ্ছে নির্দ্বিধায়। ফলে একদিকে যেমন যানজট সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে পথচারীদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। মার্কেটের ব্যবসায়ী ও ক্রেতা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। মার্কেটের সামনে ফুটপাত দখল করে রাখায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। হকার উচ্ছেদে মেয়র আরিফের ভূমিকা প্রশংসনীয়।’
অন্যদিকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় অনেকটা হেসেখেলে মেয়র পদে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ থেকে মনোনীত প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। মেয়র হিসেবে শপথ নিয়ে বসে থাকলেও এখনো দায়িত্ব নেননি। প্রবাসী হওয়ায় হকারদের জন্য সুবিধা বলে মনে করছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হকার নেতা। তাদের বক্তব্য, আনোয়ারুজ্জামান বেশির ভাগ সময় লন্ডনে থাকবেন, তাদের আর আরিফের মতো কেউ দৌড়াতে পারবেন না। এছাড়া বর্তমানেও আনোয়ারুজ্জামান লন্ডনে অবস্থান করছেন। স্মার্ট সিটি করার ঘোষণা দিলেও হকার উচ্ছেদের ব্যাপারে তার বক্তব্য এখনো পরিষ্কার হয়নি জনসাধারণের মাঝে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘যতদিন আমার মেয়াদ আছে আমি ততদিন কাজ করে যাব। দায়িত্বে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। নতুন যিনি দায়িত্বে আসছেন, তিনি একই রকম কাজ করবেন আশা করি। মাঝখানে নির্বাচন ছিল, কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ছিল অভিযান, এ সুযোগে হকাররা আবার সড়ক দখল করে নিয়েছে। তবে আমি দায়িত্ব ছাড়ার আগের দিন পর্যন্ত নগরীকে সুন্দর রাখতে যা যা করণীয় করে যাব। এরই মধ্যে অভিযান হচ্ছে।’
এ ব্যাপারে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ইলিয়াস শরিফ বলেন, ‘হকার উচ্ছেদে বরাবরই সিটি করপোরেশনকে পুলিশ সহায়তা করছে। আমরাও চাই নগরী সুন্দর থাকুক। পুলিশ সবসময় পাশে থেকে তার দায়িত্ব পালন করবে।’











