দীর্ঘ নয় মাস পর আজ থেকে পর্যটকদের জন্য খুলে দেয়া হচ্ছে প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন। এজন্য এমভি কর্ণফুলী ও এমভি বার আউলিয়া নামে দুটি জাহাজকে কক্সবাজার-সেন্ট মার্টিন রুটে চলাচলের অনুমতিও দেয়া হয়েছে। দুটি জাহাজে দৈনিক দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন। তবে রাত্রীযাপনের অনুমতি না থাকায় জাহাজ ছাড়তে চাইছেন না মালিকরা। মাত্র ১ ঘণ্টা দ্বীপে ঘুরেই আবার জাহাজে উঠতে হবে। এ কারণে পর্যটকরাও উৎসাহিত হচ্ছেন না সেন্ট মার্টিন যেতে। শুরুতেই জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ায় বিভ্রান্ত যাত্রীরাও। অনেকে ইচ্ছা থাকলেও যাত্রা বাতিল করেছেন।

এ ব্যাপারে সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ট্যুরিজম বোর্ডের সফটওয়্যার এখনো চালু হয়নি। আবার দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসার নিয়মে পর্যটক পাওয়া যাবে না। এ কারণে কোনো জাহাজ সেন্ট মার্টিনে যাবে না। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে জাহাজ চালানোর প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।’

সেন্ট মার্টিন দ্বীপের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে ১২টি নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। ২২ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নভেম্বরে পর্যটকরা শুধু দিনের বেলায় দ্বীপ ভ্রমণ করতে পারবেন, কিন্তু রাতযাপন করা যাবে না। তবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি দুই মাস রাতযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সেন্ট মার্টিন দ্বীপে কোনো নৌযান চলাচল করতে পারবে না। পর্যটকদের অবশ্যই বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট কিনতে হবে। এছাড়া প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে রাতের বেলায় সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি বা বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা ক্রয়-বিক্রয়, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধ, নিষিদ্ধ পলিথিন বহন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক (যেমন চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক চামচ, স্ট্র, সাবান ও শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক, পানির প্লাস্টিক বোতল) ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

কেয়ারি ট্যুরস অ্যান্ড সার্ভিস লিমিটেড কক্সবাজারের ইনচার্জ নূর মোহাম্মদ ছিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দিনে গিয়ে দিনে চলে আসা পর্যটকরা বিষয়টি ভালোভাবে নিচ্ছেন না। কক্সবাজার সেন্ট মার্টিন থেকে যেতে ৭ ঘণ্টা ও ফিরতে ৭ ঘণ্টা সময় লাগে। এ কারণে যাত্রী সংকট হবে। তাই প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ভর্তুকি দিয়ে জাহাজ চালানো সম্ভব নয়।’

তিন বছর আগেও টেকনাফ থেকে নয়-১১টি জাহাজে দৈনিক পাঁচ-ছয় হাজার পর্যটক নিয়ে সেন্ট মার্টিন যাতায়াত করত। ১৩ কিলোমিটারের নাফ নদী, ২১ কিলোমিটারের বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে পর্যটকরা সেখানে পৌঁছাতেন। কিন্তু মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের যুদ্ধপরিস্থিতি, সেখানকার সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রাখাইন রাজ্যে চলে যাওয়া, নাফ নদীতে চলাচলকারী বাংলাদেশী ট্রলার ও যাত্রীবাহী নৌযানে গুলিবর্ষণ, নৌকাসহ বাংলাদেশীদের অপহরণসহ বিভিন্ন ঘটনায় টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন রুটে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা হয়।

সেন্ট মার্টিন বাজার সমিতির সভাপতি আব্দুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সেন্ট মার্টিন কক্সবাজার শহর থেকে অনেক দূরে। আসতে-যেতে দিনের পুরো সময়টা চলে যায়। তাই রাত্রিযাপন ছাড়া পর্যটক এখানে আসবে না।’

সেন্ট মার্টিনের হোটেল সি প্রবালের পরিচালক আবদুল মালেক বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনকেন্দ্রিক পর্যটকরা ডে লং ট্যুর (দিনে গিয়ে দিনে আসা) প্রত্যাখ্যান করেছে। জাহাজ চলাচলের অনুমতি থাকলেও কোনো টিকিট বিক্রি হয়নি।’

দ্বীপের বাসিন্দারা বলছেন, কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিন যেতে ৭ ঘণ্টা সময় লাগে। আসা-যাওয়ায় ১৪ ঘণ্টা সময় ব্যয় করে কেউ সেখানে যাবে না। যদি কেউ যায়, বুঝতে হবে তারা হয়তো জানে না রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ সেটা।

সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, ‘দ্বীপের অর্থনীতি এখন প্রায় পঙ্গু। হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ট্রলার, দোকান সবখানেই নেমে এসেছে অচলাবস্থা। স্থানীয় মানুষের জীবিকা পুরোপুরি পর্যটননির্ভর। এখন তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। আমরা দ্বীপের পরিবেশ রক্ষার পক্ষে, তবে জীবিকার দিকটাও যেন সরকার বিবেচনায় নেয়।’

এ বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দ্বীপে মোটরযান নিষিদ্ধ ও পর্যটক নিয়ন্ত্রণে কড়া নজরদারি থাকবে। দ্বীপে পর্যটক পরিবহনের জন্য নৌযানগুলোকে অনুমতি নিতে হবে। স্থানীয়দের জন্য অনুমতির দরকার নেই। পরিবেশ রক্ষায় এ পদক্ষেপ জরুরি।’

পরিবেশ অধিদপ্তর ১৯৯৯ সালে দ্বীপটিকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ৪ জানুয়ারি বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী সেন্ট মার্টিন দ্বীপসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের ১ হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসেবেও ঘোষণা করে পরিবেশ মন্ত্রণালয়।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ট্যুরিজম বোর্ডের পরিচালক (বিপণন, পরিকল্পনা ও জনসংযোগ) সালেহা বিনতে সিরাজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌কিউআর কোডযুক্ত ট্রাভেল পাসের জন্য আমাদের অ্যাপস প্রস্তুত হয়ে গেছে। এ নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণও দিয়েছি। পর্যটকরা টিকিট কাটবেন বিডিটিকিটসের মাধ্যমে। টিকিটের মধ্যেই কিউআর কোডযুক্ত থাকবে। অ্যাপসের মাধ্যমে আমরা পর্যটক সংখ্যা মনিটর করতে পারব। বিষয়টি কঠোরভাবে তত্ত্বাবধানের জন্যই কিউআর কোডযুক্ত ট্রাভেল পাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’