আগামী জানুয়ারির শেষ নাগাদ অথবা ফেব্রুয়ারির শুরুতে দেশে নভেল করোনাভাইরাসের টিকা আসবে বলে জানিয়েছে সরকার। প্রথম দফায় তিন কোটি ডোজ টিকা আনা হবে। পরে মে ও জুনের মধ্যে আরো ছয় কোটি ডোজ টিকা আসবে। বিপুল জনগোষ্ঠীকে এ টিকা দেয়ার জন্য অতিরিক্ত লোকবল যেমন দরকার, তেমনি প্রয়োজন টিকা সংরক্ষণের ব্যবস্থা। যদিও এ দুটি ক্ষেত্রেই আলাদা প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে এখনো। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) নিয়োজিত লোকবলকে কভিড-১৯ টিকা প্রদান কার্যক্রমে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, করোনার ভ্যাকসিন বা টিকা প্রয়োগে শক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় নিয়মিত টিকা কার্যক্রমের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তবে সরকারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মিত টিকা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিভিন্ন প্রতিরোধযোগ্য রোগ নির্মূলে বাংলাদেশ বিশ্বে অনেক এগিয়ে রয়েছে। ১০টি রোগ প্রতিরোধে সারা বছর দেশে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করে সরকার। বর্তমানে চলছে হাম ও রুবেলার টিকাদানের বিশেষ কর্মসূচি। এ কারণে বিদ্যমান কোল্ড চেইন হাম ও রুবেলার টিকায় প্রায় পূর্ণ রয়েছে।

ইপিআই কর্মসূচি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ২৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩ কোটি ৭০ লাখ ডোজ হাম ও রুবেলার টিকা এবং টিকাদানসামগ্রী ক্রয় করে সরকার। ২০২১ সালের জুলাইয়ে এ টিকার মেয়াদ শেষ হবে। ১০ ডিসেম্বর এ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। এরই মধ্যে ২৫ শতাংশের মতো টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে বলে ইপিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তিনি জানান, শহরাঞ্চলে ২৪ জানুয়ারি ও গ্রামাঞ্চলে ৩১ জানুয়ারি হাম ও রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শেষ হতে পারে। এসব টিকা এখন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কোল্ড চেইনে রয়েছে। হাম ও রুবেলার টিকায় পূর্ণ কোল্ড চেইন খালি হলে তাতে করোনাভাইরাসের টিকা রাখা হবে। এক্ষেত্রে অনেক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কোল্ড চেইন খালি করার জন্য তোড়জোড় শুরু হয়েছে।

তবে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন আনা হলে সারা বছর ধরে পরিচালিত ইপিআই কর্মসূচির ভ্যাকসিন কোথায় রাখা হবে, এ প্রশ্নের কোনো উত্তর মেলেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে। যদিও করোনার টিকা রাখার কোল্ড চেইনে একসঙ্গে অন্য রোগের টিকা রাখা যাবে না বলে মত দিয়েছেন ভাইরাস ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির নিয়মিত টিকা কার্যক্রমে কোনো ধরনের বাধা পড়ে এমন কাজ করা যাবে না। করোনার টিকা প্রয়োগে নিয়োজিতরাও আলাদা হবেন। করোনার টিকাদানের জন্য ভিন্ন প্রশিক্ষণ দরকার বলে নিয়মিত কার্যক্রমের স্বাস্থ্য সহকারীরা এ কাজ করবেন না।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি ডা. রশিদ ই মাহবুব বণিক বার্তাকে বলেন, করোনার টিকা প্রয়োগের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। যেসব নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয় তা চালাতেই হবে। অন্যথায় অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে। সম্পূর্ণ আলাদা পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষিত লোকবল দিয়ে করোনার টিকা প্রয়োগ করতে পারলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে করোনার টিকা প্রয়োগে প্রথমে কতজন প্রশিক্ষিত কর্মী কাজ করবেন তা নিশ্চিত করে বলতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রশিক্ষণ এখনো শুরু করা যায়নি। এ টিকা প্রয়োগের জন্য নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির লোকবলের ওপর ‘কিছুটা’ নির্ভর করতে হবে বলে জানিয়েছেন টিকা ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মা, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্য কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. শামসুল হক।

তিনি জানান, টিকা পরিবহন, কোল্ড বক্স, আইস প্যাক, সিরিঞ্জ, মাস্ক ও পিপিইসহ বেশকিছু পণ্য কেনা হচ্ছে। এজন্য উপজেলা পর্যায়ে ৪৯০টি ফ্রিজ কেনা হচ্ছে। টিকার সুষ্ঠু প্রয়োগের জন্য ছয়জনের ১০ হাজার ৪০০টি দল ছয় মাসব্যাপী কাজ করবে। প্রতি মাসে তারা ১২ দিন টিকা প্রয়োগ করবেন। তবে শুরুতে কতজন বা কতটি দল কাজ করবে তা নিশ্চিত নয়। আমাদের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের ২৬ হাজার কর্মীর মধ্যে মাঠ পর্যায়ে ১৮ হাজার কাজ করছেন। তারা সপ্তাহে দুদিন টিকাদান কর্মসূচিতে কাজ করেন। দরকার পড়লে বাকি দিনগুলোতে তাদের করোনা টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়া সরকারি হাসপাতালের নার্সদেরও যুক্ত করা হবে করোনার টিকা প্রয়োগ কার্যক্রমে।

ইপিআই সূত্রে জানা যায়, দেশে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার এবং শিশুর পঙ্গুত্বের হার কমানোর লক্ষ্যে শূন্য থেকে ১১ মাস বয়সী সব শিশু, ১৫ মাস বয়সী সব শিশু, ১৫ বছর বয়সী সব কিশোরী, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সের সন্তান ধারণক্ষম সব নারীকে টিকা দেয়া হয়। শিশুদের যক্ষ্মা, পোলিওমেলাইটিস, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, মা ও নবজাতকের ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা-বি জনিত রোগী, হাম, রুবেলা, নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া ইত্যাদি ১০টি রোগের টিকাদান কর্মসূচি সারা বছর পরিচালিত হয়। এসব রোগের সব টিকা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ ও পরিবহন না করলে গুণাগুণ নষ্ট হয় এবং প্রয়োগের পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

ইপিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দেশে বছরে ৩৭ লাখ শিশুকে এসব টিকা দেয়া হয়। বিভিন্ন বয়সের জন্য বিভিন্ন টিকার ডোজ নির্দিষ্ট সময় পরপর দেয়া হয়। নিয়মিত কার্যক্রমের টিকাগুলো সংরক্ষণের জন্য কোল্ড চেইন ব্যবহার করতে হয়। চলমান হাম ও রুবেলার টিকা আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যবহার করতে না পারলে ভবিষ্যতে করোনার টিকা এলে তা সংরক্ষণে সমস্যা হবে। করোনার টিকা সংরক্ষণের জন্য নিয়মিত টিকা সংরক্ষণ বেশ কষ্টসাধ্য হবে। কোল্ড চেইনের সংকট নিরসনে বেসরকারি কোল্ড চেইন ভাড়া করার কথা ভাবছে সরকার। এছাড়া গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনস গ্যাভি-কোভেক্স ফ্যাসিলিটি থেকে যে ৬ কোটি ৮০ লাখ টিকা পাওয়ার কথা রয়েছে তা সংরক্ষণের জন্য বিপাকে পড়তে হতে পারে। এ জোটের ভ্যাকসিন কত তাপমাত্রায় রাখা যাবে তা নিয়ে কিছুই বলা যাচ্ছে না।

করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন রোগের টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে। করোনার টিকাদান কার্যক্রমের ফলে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে দেয়া যাবে না। আমরা সরকারকে শক্ত পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে বলেছি।

দেশে স্বাভাবিক টিকাদান কর্মসূচি যেন ব্যাহত না হয় এজন্য চেষ্টার কমতি নেই বলে মন্তব্য করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, করোনা সংক্রমণের শুরুতে অনেক ইপিআইয়ের টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে। করোনার টিকাদানের কারণে স্বাভাবিক টিকাদান যেন ব্যাহত না হয় তার চেষ্টা করছি। এখন শুধু ইপিআইয়ের টেকনিশিয়ানরা টিকাদান কর্যক্রমে কাজ করেন। আমরা এর সঙ্গে হাসপাতালের নার্সদের যুক্ত করব। এছাড়া পরিবার পরিকল্পনার লোকবল আমরা যুক্ত করতে পারব।