দেশে পেঁয়াজের বাজার মানেই অস্থিরতা। কখনো দাম আকাশচুম্বী, কখনো কৃষকের উৎপাদন খরচও ওঠে না। এ অনিশ্চয়তার মাঝেই আশার আলো দেখাচ্ছে গ্রীষ্মকালীন আগাম পেঁয়াজ চাষ। মেহেরপুরে এক দশক ধরে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এ চাষ এখন জাতীয় পর্যায়ে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনাময় বিকল্প হয়ে উঠছে।
মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে মেহেরপুর জেলায় প্রায় ১ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন আগাম পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। স্বল্প পরিসরে হলেও ফলন ও বাজারদর দুটোই আশাব্যঞ্জক।
একসময় শীতকালীন পেঁয়াজ গ্রীষ্মকালে কাদা পানিতে আবাদ করা ছিল অকল্পনীয়। আজ সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। তাদের উদ্যোগে দেশের পেঁয়াজ সংকট মোকাবেলায় তৈরি হচ্ছে এক নতুন দিগন্ত।
শীতকালীন পেঁয়াজ চাষে যেখানে লাভ-লোকসান অনিশ্চিত, সেখানে গ্রীষ্মকালীন আগাম পেঁয়াজে ফলন ও দাম দুটোই তুলনামূলক স্থিতিশীল। কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ জাতের পেঁয়াজে বিঘাপ্রতি ফলন পাওয়া যাচ্ছে ১২০ মণেরও বেশি। উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম, আর লাভের অংক দ্বিগুণের কাছাকাছি।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার সাহারবাটি গ্রামের কিবরিয়া বলেন, ‘চলতি বছরে আমার গ্রীষ্মকালীন আগাম জাতে পেঁয়াজের আবাদ ছিল তিন বিঘা। অন্যান্য পেঁয়াজের এ আবাদে লাভ বেশি করা যায় এবং অন্যান্য সময়ের তুলনায় এ সময়ে চাহিদা ও দাম দুই দিকই ভালো থাকে।’
মেহেরপুর সদর উপজেলা কালিগাংনী গ্রামের পেঁয়াজচাষী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘চলতি বছরে আমার পাঁচ বিঘা জমিতে গ্রীষ্মকালীন আগাম জাতের পেঁয়াজ চাষ করেছিলাম। এর মধ্যে ভালো দামে বিক্রি হয়েছে তিন বিঘার পেঁয়াজ। এখনো দুই বিঘার পেঁয়াজ বিক্রি চলছে।’
দেশে সাধারণত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পেঁয়াজের তীব্র সংকট দেখা দেয়। এ সময়ই বাজারে আসে মেহেরপুরের গ্রীষ্মকালীন আগাম পেঁয়াজ। চলতি মৌসুমে মুড়িকাটা পেঁয়াজ যেখানে পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, সেখানে আগাম পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬০-৮০ টাকা দরে। ফলে কৃষকরা পেয়েছেন উল্লেখযোগ্য লাভ।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে যখন প্রচলিত পেঁয়াজ পুরোপুরি বাজার দখল করে, তার আগেই বিক্রি শেষ হয়ে যায় গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ। এতে একদিকে কৃষক নিশ্চিত দাম পান, অন্যদিকে ভোক্তারা সংকটের সময় কিছুটা স্বস্তি লাভ করেন। তবে সম্ভাবনার পথ একেবারে মসৃণ নয়।
একই এলাকার আয়নাল হক জানান, এ বছর তার দুই বিঘা পেঁয়াজ ছিল। ভালো দামে বিক্রি হয়েছে। লাভের মুখ দেখলেও নানা সমস্যার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের উপযুক্ত জাতের বীজ পাওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে এই চাষের জন্য স্বীকৃত একমাত্র জাত বারি পেঁয়াজ-৫ যা চাহিদার তুলনায় খুবই সীমিত। ফলে অনেক কৃষককে নির্ভর করতে হচ্ছে ভারত থেকে আমদানীকৃত কালাস, বিপ্লবসহ কয়েকটি জাতের ওপর।
এছাড়া আধুনিক চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে আমাদের কেউ কেউ লোকসানের মুখেও পড়ছেন। কৃষি অফিস সার ও বীজ বিতরণ করলেও তা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জীব মৃধা জানান, প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন আগাম পেঁয়াজ চাষকে আরো বিস্তৃত করতে কৃষকের প্রযুক্তিগত জ্ঞান বৃদ্ধি এবং মানসম্মত বীজ-সার সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে উৎপাদন বাড়বে, আমদানিনির্ভরতাও কমবে।










