মোজাম্মেল হক। ডাক নাম মোজাম। বাড়ি বুড়িগঙ্গা নদীর কোল ঘেঁষে বসিলায়। পেশায় একজন মাঝি। বয়স ৫০ এর কাছাকাছি। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাবার সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবার পেশাকেই (মাঝি) নিজের পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন।
বুড়িগঙ্গা নদীতে তার সঙ্গে দেখা হয় বণিক বার্তার। কথার এক পর্যায়ে তিনি নদীর তীরে তার জীবন বর্ণনা করেন। বলেন, ছোটবেলায় বর্ষাকালে আমাদের আনন্দ লেগে থাকত। আমরা দল বেঁধে নদীতে আসতাম মাছ ধরতে। পানিতে খেলতে। ডুব দিলেই মাছ পাওয়া যেতো। চিংড়ি মাছ, কই মাছ, শিং মাছ সহ অনেক ধরনের মাছ পেতাম। কিন্তু এখন পুরো নদী সাকার মাছে ভরে গেছে। দেশীয় কোনো মাছ দেখা যায় না, জালে আসে না।
একসময় বুড়িগঙ্গা নদীর ছিল ভরা যৌবন। কোনো ধরনের দুর্গন্ধ ছিল না, ছিল না দূষিত ও কালো পানি। স্বচ্ছ পানিতে সাঁতার কাটার পাশাপাশি মাছ ধরতেন স্থানীয়রা। এসব অন্তত চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের কথা। বিভিন্ন কারখানা, ট্যানারি ও ময়লা পানির কারণে দূষিত হয়েছে নদীর পানি। সে সঙ্গে, নদীর পাড়ের মানুষের জন্য হয়ে দাঁড়িয়েছে দুঃখের কারণ। মাঝি, জেলে ও স্থানীয়রা বুড়িগঙ্গা নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। বর্ণনা করেন, কেমন ছিল অন্তত চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগের বুড়িগঙ্গা।
বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বসিলার বাসিন্দা আরেক মাঝির নাম আবুল কালাম। প্রায় ৪০ বছর যাবৎ তিনি বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকার বৈঠা বেয়ে যাচ্ছেন। এ পেশা দিয়ে তিনি তার পরিবারের খরচ চালান। কথা বলতে বলতে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, পঞ্চাশ বছর আগের আর বর্তমানের বুড়িগঙ্গার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। বুড়িগঙ্গার পানিতে আমরা গোসল করতাম, মাছ ধরতাম, রান্না করতাম, নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতাম। সে বুড়িগঙ্গা এখন বর্ষাকাল ছাড়া প্রায় সব ঋতুতে ভয়ংকর দুর্গন্ধ ছড়ায়। কেউ পানিতে নামলে, কাদার মধ্যে পা দশ মিনিটের বেশি আটকে থাকলে কালো হয়ে যায়, বিভিন্ন ধরনের পানিবাহিত রোগ ও অ্যালার্জির সমস্যা দেখা যায়। ছোটবেলায় আমরা এ নদীর পানি পান করেছি। কিন্তু এখন শীত ও গ্রীষ্মকালে নদীর পাশে আসা যায় না। ভয়াবহ দুর্গন্ধ, কালো পানিতে বুড়িগঙ্গা পূর্ণ। আগে এ নদীতে কোনো ময়লার লাইন ছিল না এখন ময়লার লাইন, কারখানা ও ট্যানারির বর্জ্যে পানি দূষিত হয়ে গেছে। কোনো অক্সিজেন নেই।
বুড়িগঙ্গা নদীর তীরের আরেক বাসিন্দা মানিক হোসেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, শীতকালে নদী শুকিয়ে আসবে। পানি আরো কালো, দুর্গন্ধ হয়ে যাবে। নদীর আশপাশের মানুষদের ভোগান্তি পোহাতে হবে। আর ভেসে উঠবে ছোট ছোট মরা মাছ। সাকার মাছের উৎপাতে দেশীয় মাছ প্রায় বিলুপ্ত। যেসব মাছ থাকে সেগুলো শীতকালে মারা যায়।
তিনি আরো বলেন, এ নদীতে ছোটবেলায় কত জলজ প্রাণী দেখেছি। গুইসাপ, কচ্ছপ, সাপ, কাঁকড়া, বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ— সব দেখেছি। কিন্তু এখন জাল ফেললেও কোনো মাছ আসে না। উল্টো যারা জাল ফেলে বা পানিতে বেশিক্ষণ থাকে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে।










