রাষ্ট্রায়ত্ত চার বাণিজ্যিক ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ব্যাংকগুলো হলো সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংক। গতকাল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে নতুন এমডি নিয়োগ, তথা মনোনয়নের চিঠি সংশ্লিষ্ট চার ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়।
এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের এমডি পদে মো. শওকত আলী খানকে পুনর্বহাল করা হয়েছে। যদিও এক সপ্তাহ আগে ১৯ অক্টোবর ব্যাংকটির এমডি পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। আর রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে মো. মাহবুব আলমকে। তিনি বেসরকারি খাতের সাউথইস্ট ব্যাংক পিএলসির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) পদে কাজ করছেন।
একইভাবে বেসরকারি খাতের যমুনা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) নুর মোহাম্মদকে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আর বেসিক ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ পেয়েছেন জনতা ব্যাংকের ডিএমডি মো. নূরুল হুদা। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত তিন এমডিকে যোগদানের তারিখ থেকে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আর সোনালী ব্যাংকের এমডি শওকত আলী চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর তাকে এ পদে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
এতদিন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে বেসরকারি খাত থেকে এমডি নিয়োগ দেয়ার একমাত্র উদাহরণ ছিলেন সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। ২০০৪ সালে সাউথইস্ট ব্যাংকে কর্মরত থাকা অবস্থায় তাকে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ দিয়েছিল সরকার। দুই মেয়াদে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি ব্যাংকটির এমডি পদে ছিলেন।
বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করা সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এমডি নিয়োগ-সংক্রান্ত চিঠি পেয়েছি। কিন্তু কী বিবেচনায় এ নিয়োগ দেয়া হয়েছে, সেটি বোধগম্য নয়। যাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তার সঙ্গে আমার কোনোদিন দেখা হয়নি। নিয়োগের আগে অন্তত একদিন যদি আমরা তাকে দেখতাম, কথা হতো, তাহলে বুঝতে পারতাম তিনি ব্যাংকের জন্য কতটা ভূমিকা রাখতে পারবেন।’
গতকাল চারটি ব্যাংকের এমডি নিয়োগ দেয়া হলেও এখনো রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) এমডি পদ খালি রয়েছে। এছাড়া বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি) এমডি পদেও নতুন কাউকে নিয়োগ দেয়া হতে পারে বলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে।
প্রসঙ্গত, দেশের সরকারি মালিকানাধীন নয়টি ব্যাংকের আটটিই এখন লোকসানে, আর বিতরণকৃত ঋণের প্রায় অর্ধেকই খেলাপি। বিপুল খেলাপি ঋণের চাপে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে, বাড়ছে মূলধন ঘাটতিও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৩৬৯ কোটি টাকাই খেলাপি, যা বিতরণকৃত ঋণের ৪৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
একসময় সরকারি খাতের ভালো ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃত ছিল জনতা ব্যাংক পিএলসি। যদিও বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে ব্যাংকটি। ২০২৪ সালে ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা নিট লোকসানের পর ২০২৫ সালেও ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৬ হাজার কোটি টাকায়, যা বিতরণকৃত ঋণের ৭৫ শতাংশেরও বেশি। একই সঙ্গে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতিও ৬৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৪৪ শতাংশ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় চাপে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকও। গত জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকায়। বিপুল পরিমাণ এ খেলাপি ঋণ থেকে আয় না হওয়ায় লোকসানে পড়েছে ব্যাংকটি।
খেলাপি ঋণের উচ্চ হার ও কার্যক্রমে স্থবিরতার কারণে লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকেরও। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ৬৪০ কোটি টাকার পরিচালন লোকসান গুনেছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সরকারি খাতের একমাত্র ব্যাংকটি। অন্যদিকে ২০০৯ সাল-পরবর্তী সময়ে লুটপাটের শিকার হওয়া বেসিক ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে লোকসান দিয়ে আসছে ২০১৩ সাল থেকে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত ১৩ বছরে ব্যাংকটি নিট লোকসান দিয়েছে ৬ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সোনালী ব্যাংক পিএলসি। বর্তমানে অন্য সরকারি ব্যাংকগুলোর তুলনায় তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে ব্যাংকটি। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ স্থিতি ছিল ১৫ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ১৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) সোনালী ব্যাংক ৫ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার পরিচালন আয় করেছে। তবে এ আয়ের ৮৩ শতাংশেরও বেশি এসেছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদ থেকে।
লোকসানের দিক থেকে সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকটির নিট লোকসান ছিল ৮ হাজার ২১৮ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও ৬ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছিল ব্যাংকটি। ধারাবাহিক লোকসান ও খেলাপি ঋণের উচ্চ হারের কারণে কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ এখন ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
বিশেষায়িত ব্যাংক হিসেবে পরিচিত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের পরিস্থিতিও নাজুক। গত দুই অর্থবছরে রাকাব নিট লোকসান দিয়েছে ২৯৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের লোকসানের পরিমাণ ছিল ১৬২ কোটি টাকা। গত বছর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকও (বিডিবিএল) ৬৯ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে।










