নির্বাচনের সময় ঘোষণার পর থেকে বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচনের দাবির প্রতি অনড় বিএনপি। তবে প্রধান উপদেষ্টার এ ঘোষণায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মৌন সমর্থনও রয়েছে। ফলে নির্বাচনের সময় নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, যা রাজনৈতিক সংকটের দিকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। সেই দাবি উপেক্ষা করে এপ্রিলের প্রথমার্ধে নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়ের কথা বলা হয়েছে, সেটিও নানা কারণে বিতর্কিত। ফলে যেসব রাজনৈতিক দল ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের পক্ষে রয়েছে, তারা তাদের দাবি নিয়ে আন্দোলন বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গেলে সংকট তৈরি হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে যে ২৬টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা কথা বলেছেন, তাদের মধ্যে ২৩টি দলের পক্ষ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নির্বাচনের যে সময়ের কথা বলা হয়েছে আদৌ ওই সময়ে নির্বাচন করা সম্ভব কিনা। কারণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রোজার সময় নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা হয় না। রোজা রেখে প্রচার-প্রচারণা করা সমস্যা। আরেকটা বিষয় রোজার সময় যেকোনো সংঘাতের ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পক্ষে দমন করাও কঠিন হয়ে পড়বে। তাছাড়া এপ্রিল হচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাস। বড় বড় ঘূর্ণিঝড়-বজ্রপাতের মতো ঘটনা এ সময় ঘটে থাকে। এছাড়া এপ্রিলে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশের পরীক্ষাও রয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আবার যারা এপ্রিলে নির্বাচন সমর্থন করেছেন তারা নির্বাচনের আগে বেশকিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছেন যেমন জুলাই সনদ, জুলাই ঘোষণাপত্র, এরপর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে নাকি জাতীয় নির্বাচন আগে, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। এ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ইস্যু সমাধান না হলে আমার কাছে মনে হয় না যে এপ্রিলেও নির্বাচন হবে! অর্থাৎ যে সংকট তৈরি হচ্ছে সেটি আমরা জিইয়ে রাখতে চাই কিনা।’

গত শুক্রবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে নির্বাচনের প্রাথমিক রোডম্যাপ ঘোষণা দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমি দেশবাসীর কাছে ঘোষণা করছি যে আগামী জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রথমার্ধের যেকোনো একটি দিনে অনুষ্ঠিত হবে। এ ঘোষণার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন উপযুক্ত সময়ে আপনাদের কাছে নির্বাচনের বিস্তারিত রোডম্যাপ প্রদান করবে।’

নির্বাচনের সময় ঘোষণার পর জরুরি বৈঠকে বসে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি। ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন লন্ডনে থাকা দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে উপস্থিত বিএনপির এক স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের কড়া সমালোচনা করা হয়। এপ্রিলে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাবকে বাস্তবতাবিবর্জিত বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি এটি দেশের রাজনৈতিক সংকটকে আরো ঘনীভূত করতে পারে বলেও অধিকাংশ সদস্য মতামত প্রকাশ করেন। এছাড়া বন্দর ও করিডোর ইস্যুতে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য নিয়ে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

বৈঠক শেষে গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায় বিএনপি। এতে বলা হয়, ‘দীর্ঘ ভাষণে তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) বন্দর, করিডোর ইত্যাদি এমন সব বিষয়ের অবতারণা করেছেন, যা তারই ভাষায় অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি ম্যান্ডেটের মধ্যে পড়ে না।’ ভাষণে ড. ইউনূস শব্দচয়নে ‘রাজনৈতিক ভব্যতার সীমা’ অতিক্রম করেছেন জানিয়ে সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা যে সময় নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছেন, তা বাস্তবসম্মত নয়। আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্যও নয়। কারণ এপ্রিল নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যথোপযুক্ত সময় নয়। গণতন্ত্রে উত্তরণ বিলম্বিত হলে সংকট আরো ঘনীভূত হবে।’

নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থান সম্পর্কে একই ধরনের মতামত দেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘যে সময়টি (এপ্রিল) নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি বাংলাদেশে নির্বাচনের জন্য সঠিক সময় নয়। এপ্রিলে প্রচণ্ড গরমের পাশাপাশি ঝড়-বৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। ওই সময়টি রোজার পরপরই এবং তখন পাবলিক পরীক্ষাও আছে। সময়টা খুব চিন্তা করে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে আমাদের কাছে মনে হয় না। এছাড়া নির্বাচনী প্রচারণা করতে হবে রোজার মাসে, যেটা কঠিন। আমাদের যে রিমার্কস সেটা আমাদের স্ট্যাডিং কমিটি গতকাল রাতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা মতামত জানিয়েছেন। আমরা মনে করি যে ডিসেম্বরেই নির্বাচন হওয়া সম্ভব। সেটাই জাতির জন্য সবচেয়ে উপযোগী হবে।’

এদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এপ্রিলের নির্বাচন নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। এ-সংক্রান্ত পৃথক বিবৃতিতে এ অভিব্যক্তি প্রকাশ করে দল দুটি। এদিকে গতকাল জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নের নিজ গ্রামের তুলাপুর পাঁচগাঁও ঈদগাহে নামাজ শেষে বলেন, ‘জাতি যেনতেন নির্বাচন চায় না। বিচার, সংস্কার, জুলাই ঘোষণাপত্র ও ভোটের সমতল মাঠ থাকলে রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্বাচন সম্ভব হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘পরপর তিনবার মানুষ ভোট দেয়ার সুযোগ পায়নি। এবার নতুন ভোটার যুবসমাজকে ভোটের সুযোগ করে দিতে হবে। প্রধান উপদেষ্টা কোনো সহযোগিতা চাইলে আমরা সহযোগিতা করব। তবে দেশের সংকট শেষ হওয়া খুবই জরুরি।’

অপরদিকে বিবৃতি দিয়ে এনসিপি বলেছে, ‘জুলাই সনদের সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হলে তারা ঘোষিত সময়ের মধ্যে নির্বাচনের বিরোধিতা করবে না।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের দাবিকে উপেক্ষা করেছেন। তিনি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছেন কেন ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়। এপ্রিল কেন উপযুক্ত সময়—সে বিষয়টিও অস্পষ্ট থেকে গেছে। ফলে নির্বাচন ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি হলে সেটি সংকটে রূপ নিতে পারে।