কালো পাথরে মোড়ানো দেয়াল। পাথরের গায়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ। মেহরাবে ফুল, লতাপাতা ও ঝুলন্ত শিকলের নকশা। মাথার ওপর ছয়টি গম্বুজ। সামনে বিশাল দিঘি। স্থাপত্য, ইতিহাস ও প্রকৃতির এমন মেলবন্ধন দেখা যায় নওগাঁর মান্দা উপজেলার কুসুম্বা শাহী মসজিদে। প্রায় সাড়ে চার শতকের পুরনো এ মসজিদ শুধু মুসলমানদের উপাসনালয় নয়, এটি দেশের প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। সময়ের সঙ্গে মসজিদটি নওগাঁর অন্যতম দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের দর্শনার্থীর পাশাপাশি বিদেশী পর্যটকেরাও এখানে আসেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ৯১০ হিজরিতে কুসুম্বা শাহী মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয়। দীর্ঘ ৫৬ বছর পর ৯৬৬ হিজরিতে এর নির্মাণ শেষ হয়। অর্থাৎ ১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দে আফগানদের শূর বংশের শেষ দিকের শাসক গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহের শাসনামলে মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। মসজিদের মূল কাঠামো ইটের তৈরি হলেও বাইরের পুরো দেয়াল কালো পাথরে মোড়ানো। উত্তর-দক্ষিণে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৫৮ ফুট ও প্রস্থ ৫২ ফুট। ছাদের ওপর রয়েছে ছয়টি গোলাকার গম্বুজ। মসজিদের দেয়াল, মেহরাব ও অন্যান্য অংশের কারুকাজে প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর পরিচয় পাওয়া যায়।

মসজিদ চত্বরে প্রবেশের আগেই চোখে পড়ে বাক্সের মতো একটি কালো পাথর। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, এক কৃষক হালচাষের সময় জমিতে পাথরটি দেখতে পান। লাঙলের ফলার আঘাতে পাথরটির কিছু অংশ ভেঙে যায়। পরে সেটি তুলে এনে রাস্তার পাশে রাখা হয়। পাথরটির গায়ে তোগড়া হরফে আরবি লিপি খোদাই করা রয়েছে। লিপিটির পাঠোদ্ধার অনুযায়ী, সেখানে আবুল মোজাফফর হোসেন শাহের নামের উল্লেখ রয়েছে। তিনি সৈয়দ আশরাফ আল হোসেনের ছেলে ছিলেন বলে ওই লিপিতে উল্লেখ রয়েছে। এ কারণে পাথর খণ্ডটিকে হোসেন শাহের সময়ের একটি স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন হিসেবে দেখা হয়।

34

মসজিদের সামনে প্রায় ৭৭ বিঘা আয়তনের বিশাল একটি দিঘি রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এটি কুসুম্বা দিঘি নামে পরিচিত। এ দিঘিকে ঘিরে রয়েছে নানা লোককথা। স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করেন, দিঘির তলদেশে পারদ মিশ্রিত থাকায় পানিতে কচুরিপানা বা অন্যান্য আগাছা জন্মায় না। তবে এ দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিশ্চিত নয়। দিঘিতে নামার জন্য রয়েছে দুটি শান বাঁধানো সিঁড়ি। মুসল্লিরা সেখানে ওজু করেন। দর্শনার্থীরাও দিঘির পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে কিছুটা স্বস্তি নেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ সেখানে গোসলও করে।

মসজিদের ভেতরে রয়েছে ‘কাজী মঞ্চ’। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, একসময় এখানেই বসে কাজীরা বিচারকাজ পরিচালনা করতেন। মসজিদকেন্দ্রিক বিচার ব্যবস্থার বিভিন্ন কার্যক্রমও এ স্থানকে ঘিরে পরিচালিত হতো বলে স্থানীয়দের ধারণা। বর্তমানে কুসুম্বা শাহী মসজিদে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। নারীদের নামাজ আদায়ের জন্যও রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা।

নওগাঁ জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে কুসুম্বা শাহী মসজিদ। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রাচীরবেষ্টিত মসজিদটির প্রবেশপথ পেরোলেই চোখে পড়ে প্রাচীন স্থাপত্যের নানা নিদর্শন। কালো পাথরে মোড়ানো দেয়ালে ফুটে উঠেছে নানা নকশা। মেহরাবের ফুল, লতাপাতা ও ঝুলন্ত শিকলের কারুকাজ দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মসজিদকে ঘিরে আশপাশে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন দোকানপাট। ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে প্রতিদিনই এখানে দর্শনার্থীর আনাগোনা থাকে। শুক্রবার ও দুই ঈদের সময় দর্শনার্থীর সংখ্যা আরো বেড়ে যায়।

মসজিদের মোয়াজ্জিন ইসরাফিল আলম বলেন, ‘আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এ মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তার আমলে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ৫৬ বছর পর গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহের শাসনামলে গিয়ে শেষ হয়। এখনো নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। দেশের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও নানা দেশ থেকে দর্শনার্থী মসজিদটি দেখতে আসেন। দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের রেস্ট হাউজে স্বল্প খরচে থাকার সুযোগ রয়েছে। পর্যটকদের সুবিধার জন্য বিভিন্ন উন্নয়নকাজও চলমান রয়েছে।’

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রতিনিধি হিসেবে কুসুম্বা শাহী মসজিদের সংরক্ষণ ও দেখভালের দায়িত্বে আছেন নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের কাস্টোডিয়ান ফজলুল করিম আরজু। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কুসুম্বা শাহী মসজিদ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। ছুটির দিনগুলোয় দর্শনার্থীর সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। এটি নিয়ে আমাদের একটি মাস্টারপ্ল্যান আছে। কুসুম্বা মসজিদকে ষাট গম্বুজের আদলে ঢেলে সাজানো হবে।’