বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছে খুলনা অঞ্চলের মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানাগুলো। দিন-রাত মিলিয়ে কোথাও ৬-৭ ঘণ্টা, আবার কোথাও ১৫-১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে উৎপাদন কমে অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে। জেনারেটর চালিয়ে হিমাগারে চিংড়ি সংরক্ষণে খরচ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
অন্যদিকে লোডশেডিংয়ের কারণে বরফ উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন খামার পর্যায়ের চিংড়ির ক্রেতা ও ডিপো মালিকরা। চাহিদামতো বরফ না পাওয়ায় রফতানি প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় চিংড়ি সরবরাহ করতে পারছেন না তারা। জেলার কয়রা, পাইকগাছা, ডুমুরিয়া, দাকোপসহ কয়েকটি উপজেলার চিংড়ি মোকাম ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, করোনাভাইরাস পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোয় চিংড়ির চাহিদা বেড়েছে। দেশে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, বরগুনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী ও ময়মনসিংহে চিংড়ি চাষ হলেও রফতানির প্রায় ৮০ ভাগ চিংড়ি খুলনা অঞ্চলের কারখানা থেকে যায়।
খুলনায় ৩৩টি চিংড়ি প্রক্রিয়াজাত কারখানা চালু রয়েছে। বর্তমানে চিংড়ির ভরা মৌসুম চলছে। রফতানির জন্য মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানাগুলোয় কাজ হচ্ছে দিন-রাত। তবে লোডশেডিংয়ে সেগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না।
রফতানিকারকরা জানান, ডলার সংকট মেটাতে পণ্য রফতানি বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। অথচ অব্যাহত লোডশেডিংয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম এ খাত এখন নাকাল। রফতানিপণ্য উৎপাদনের এ খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন তারা।
মৎস্য পরিদর্শন ও মাননিয়ন্ত্রণ দপ্তর খুলনার উপপরিচালক মো. আবু ছাইদ জানান, দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে লোনাপানির ‘সাদা সোনা’খ্যাত চিংড়ি শিল্প। বিদেশে বাজারের সুযোগ থাকায় গত শতকের আশির দশকে খুলনাঞ্চলের এ পণ্যটির ব্যাপক চাষ শুরু হয়েছে।
আবু ছাইদ বলেন, হিমায়িত চিংড়ি ও মাছ রফতানি করে প্রতি বছর প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে চিংড়ি রফতানি করে আয় হয়েছে ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি এস হুমায়ুন কবির বলেন, হিমায়িত চিংড়ি বাংলাদেশের একটি ১০০ ভাগ কৃষিভিত্তিক ও রফতানিমুখী শিল্প খাত। সারা দেশের গ্রামগঞ্জের প্রায় দেড় কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ উৎপাদন, বিপণন, প্রক্রিয়াকরণ ও রফতানিতে নিয়োজিত। সরকার বলছে, এ খাতে রফতানি বাড়াও, দেশে ডলার আনো। কিন্তু রফতানি বাড়ানোর কোনো সহযোগিতাই পাওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ সংকটে অধিকাংশ কারখানার উৎপাদন অর্ধেকেরও নিচে নেমেছে।
হুমায়ুন কবির আরো বলেন, এলাকাভেদে খুলনার কিছু কারখানা ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) এবং কিছু পল্লী বিদ্যুতের আওতায় পড়েছে। ওজোপাডিকোর আওতাধীন কোম্পানিগুলো কিছু বিদ্যুৎ পেলেও বাকিগুলোর অবস্থা নাজুক। পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় অনেক কারখানার উৎপাদন বন্ধ।
অন্যদিকে জেনারেটর দিয়ে চিংড়ির গুণগত মান ঠিক রাখতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।
মৎস্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান মডার্ন সি ফুডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল হক বলেন, অব্যাহত লোডশেডিংয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। তাদের কারখানাগুলোয় প্রক্রিয়াজাত করেই নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় চিংড়ি সংরক্ষণ করতে হয়। তা না হলে চিংড়ির গুণগত মান নষ্ট ও বিদেশে সুনাম নষ্ট হয়।
রোজেমকো ফুডস লিমিটেডের পরিচালক সেলিম রেজা বলেন, পল্লী বিদ্যুতের আওতায় থাকায় প্রতিদিন ১৪-১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বাকি ৭-৮ ঘণ্টা থাকে লো-ভোল্টেজ। আমরা কারখানার কোনো যন্ত্রই চালাতে পারছি না। বিদেশে অর্ডার থাকা সত্ত্বেও গত ১৫ দিনে চিংড়ি রফতানি করতে পারিনি। জেনারেটর দিয়ে কোনো রকম হিমাগার চালু রেখেছি। এতে প্রতিদিন অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা।
ন্যাশনাল সি ফুডের নির্বাহী পরিচালক আতিকুর রহমান বলেন, চিংড়ি পচনশীল পণ্য। যত দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করা যাবে, গুণগত মান তত ভালো থাকবে। এ কারণে ২৪ ঘণ্টাই কারখানা চালু রাখতে হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকলে সব অচল।
তিনি বলেন, বিদ্যুতের অভাবে উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। এভাবে চললে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা কমাতে সারা দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোকে সাতটি ভাগে ভাগ করে সাপ্তাহিক ছুটি আলাদা করে দিয়েছে সরকার। এতে হয়তো কিছুটা হলেও সুফল মিলবে।










