দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অনেকটাই উত্তপ্ত রাজনীতির মাঠ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বেশ কয়েকটি দলকে নিয়ে ভোটে অংশ নিলেও তা প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। সরকার পতনের এক দফা দাবিতে তারা হরতাল-অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। সংঘাত, সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও ঘটেছে। ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নিরাপত্তায় পুলিশ ও র্যাবের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও আনসার। মহাসড়কে বিশেষ নিরাপত্তা দিয়ে বিভিন্ন যানবাহনকে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। এসব সেবা দিতে গিয়ে জননিরাপত্তা ব্যয়ের চাহিদা বেড়েছে নয় গুণের বেশি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনী বছরে অতিরিক্ত পোশাক, অস্ত্র-গোলাবারুদসহ অনান্য খাতে ১ হাজার ৩০ কোটি টাকা অতিরিক্ত চেয়েছে পুলিশ। ভবন ভাড়া, পুরস্কার, ভ্রমণ ও বদলিজনিত ব্যয় বাবদ অতিরিক্ত বরাদ্দের চাহিদা জানিয়েছে র্যাবও। নির্বাচন-পরবর্তী একই পরিস্থিতি থাকলে এসব খাতে আরো অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে হরতাল-অবরোধে রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব স্থানে দায়িত্ব পালন করছে বিজিবি। এর জন্য তাদের ভ্রমণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি টাকা। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাহিনীটির অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে ৪৬ কোটি টাকার। পাশাপাশি জ্বালানি বাবদ সাড়ে ৪ কোটি টাকার বিপরীতে ২৪ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। নাশকতা প্রতিরোধে পুলিশকে সহযোগিতায় মাঠে থাকা আনসার সদস্যদের খোরাকি ভাতা হিসেবে বর্তমান বরাদ্দ ২ কোটি টাকা। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণ দেখিয়ে অতিরিক্ত ৩০ কোটি টাকা চাহিদার কথা জানানো হয়েছে সরকারকে। যাতায়াত ভাতা হিসেবে ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ৬ কোটি টাকার অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে আনসারের। সব মিলিয়ে বিজিবি ও আনসার সদস্যদের জন্য প্রায় ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও অতিরিক্ত চাহিদা দেয়া হয়েছে ১০৬ কোটি টাকা।
বাহিনীসংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণ পরিস্থিতির তুলনায় হরতাল ও অবরোধে কয়েক গুণ অতিরিক্ত লোকবল মোতায়েন করতে হয়। তাদের দৈনিক খোরাকিও এ খাত থেকেই নিশ্চিত করতে হয়। পাশাপাশি নাশকতা প্রতিরোধে টহল কার্যক্রম পরিচালনার ফলে ভ্রমণ ও জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হচ্ছে। নির্বাচন-পরবর্তী একই পরিস্থিতি থাকলে এসব খাতে আরো বাড়তি বরাদ্দের প্রয়োজন হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে এসব ব্যয় বাহিনীর সংশোধিত বাজেটের অন্যান্য খাত থেকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
নির্বাচনী অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে পুলিশ ১ হাজার ৩০ কোটি টাকার যে অতিরিক্ত চাহিদা জানিয়েছে তার মধ্যে বিদ্যুৎ, নিবন্ধন ফি, জ্বালানি, চিকিৎসা, অস্ত্র ও গোলাবারুদ, নিরাপত্তাসামগ্রী, খাদ্য, বেতার সরঞ্জামাদি ও আসবাব রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ কিনতে। বাজেটে এ খাতে ২২১ কোটি ২২ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। অতিরিক্ত চাহিদা দেয়া হয়েছে ৪১৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদ কিনতে সংশোধিত বাজেটে মোট চাহিদা দেয়া হয়েছে ৬৩৫ কোটি ২২ লাখ টাকা। এছাড়া পোশাক কেনার জন্য বাজেটে ৫০৩ কোটি ৮০ লাখ টাকার সঙ্গে ৯৮ কোটি টাকার অতিরিক্ত চাহিদা দেয়া হয়েছে। র্যাবের বিদ্যমান বাজেটের সঙ্গে অতিরিক্ত চাহিদা দেয়া হয়েছে প্রায় ২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে রয়েছে অফিস ভবন ভাড়া, ভ্রমণ ব্যয় ও বদলি ব্যয়। কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকেও ৯৭ কোটি টাকার অতিরিক্ত চাহিদা প্রস্তাব করা হয়েছে। বাহিনীটি মূলত পুরস্কার, অস্ত্র ও গোলাবারুদ, পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে বাড়তি টাকা চেয়েছে।
অতিরিক্ত এসব চাহিদা নিয়ে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় আলোচনা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে সারা দেশে মোতায়েন করা বিজিবি ও আনসার সদস্যদের জন্য ওই সভায় ১০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের সুপারিশ করা হয়। জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় পুলিশের প্রতিনিধি ছিলেন অতিরিক্ত আইজিপি আবু হাসান মুহাম্মদ তারিক। তিনি জানান, পুলিশ ও র্যাবের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত যে চাহিদা দেয়া হয়েছে তা প্রয়োজনের নিরিখে বিদ্যমান বাজেটের বিভিন্ন খাতের সঙ্গে সমন্বয় করেই মেটানো সম্ভব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব বিকাশ বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কর্তব্যরত ফোর্সের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে এসেছে। বাজেট ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় অতিরিক্ত বরাদ্দের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা তাদের মতামত তুলে ধরেছেন। এসব প্রস্তাব ও মতামত ঊর্ধ্বতনদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে অনুমোদন হয়ে এলেই কেবল বলা যাবে অতিরিক্ত কত বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে।’










