কক্সবাজার, ময়মনসিংহ ও যশোর মানব পাচারের হটস্পট হয়ে উঠেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। দেশে মানব পাচার প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে আগামী দুই বছরের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাবলিক সিকিউরিটি ডিভিশনের ন্যাশনাল প্ল্যান অব অ্যাকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড সাপ্রেশন অব হিউম্যান ট্রাফিকিং (আপডেটেড ২০২৩-২৫) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ এবং যশোর জেলা মানব পাচারের হটস্পট হয়ে উঠেছে। এ তিন জেলার মতো অতিরিক্ত মানব পাচারের মামলা যেসব জেলায় রয়েছে, সেখানে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করতে হবে। এসব বিশেষ ট্রাইব্যুনালকে সঠিক অবকাঠামো, সরঞ্জাম ও ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন হতে হবে। সেখানে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি এসব ট্রাইব্যুনালে ভুক্তভোগীদের মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অবস্থায় এসব ট্রাইব্যুনালে ভুক্তভোগীদের হয়রানি বা সেবা প্রাপ্তিতে বাধা তৈরি করা যাবে না।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নারী ও শিশু পাচারের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে যশোর সীমান্তে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীর কাছে যশোরের শার্শা উপজেলার একাধিক চোরাচালান সিন্ডিকেটের তথ্য রয়েছে। উপজেলার বাহাদুরপুর, পুটখালী ও বেনাপোল ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম একেবারে সীমান্ত ঘেঁষা। এখান দিয়ে স্বর্ণ, অস্ত্র, গরু, বিস্ফোরক ও মানব পাচার করা হয়। যশোরের পাশাপাশি কক্সবাজারের টেকনাফকেন্দ্রিক দুটি চক্রের তথ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে রয়েছে। সেখানে মূলত জল সীমান্ত ব্যবহার করে পাচারের ঘটনা ঘটে। ময়মনসিংহ থেকে সোমেশ্বরী নদী পেরিয়ে ভারতের মেঘালয়ে মানব পাচারের কয়েকটি চক্রের তথ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে রয়েছে। জেলার ধোবাউড়া উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া, পোড়াকান্দুলিয়া ও ঘোষগাঁও দিয়ে বেশি মানব পাচারের ঘটনা ঘটে। সীমান্তের ওপারে মেঘালয়ের বাঘমারায় নিয়ে ভুক্তভোগীদের নির্যাতন করে অর্থ আদায় করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অর্থ আদায়ের পর ভুক্তভোগীদের মুক্তি দেয়া হয় না। বরং বিক্রি করে দেয়া হয় অন্য চক্রের কাছে।

যশোর সীমান্ত দিয়ে পাচার হওয়া এক নারীর সঙ্গে কথা বলেছে বণিক বার্তা। ময়মনসিংহের ওই নারী জানান, তিনি যাত্রাবাড়ীর একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। কভিড-১৯ মহামারীর সময় চাকরি চলে যায়। নতুন কাজের সন্ধানে ঘুরতে থাকেন। সৌদি আরবে পাঠানোর কথা বলে তাকে নেয়া হয় যশোরের শার্শা উপজেলায়। বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে পাচার করা হয় ভারতের বসিরহাটে। পরে কলকাতার একটি যৌনপল্লীতে বিক্রি করে দেয় পাচারকারী চক্র। একটি এনজিওর সহায়তা নিয়ে তিনি দেশে ফেরেন। এরপর শার্শা থেকে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এছাড়া গত বছরের মাঝামাঝি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার একটি গার্মেন্টসের দুই নারী শ্রমিককে ওমানে বিউটি পার্লারে চাকরির কথা বলা হয়। রাজি হলে তাদের রূপগঞ্জ থেকে ঢাকায় আনা হয়। দুদিন ঢাকায় লুকিয়ে রেখে তাদের যশোর নিয়ে যায় দালালরা। রাতে ঝিনাইদহের গোপালপুর সীমান্ত পার করে ভারতে নিয়ে ৬ লাখ টাকায় আরেক দালালের কাছে বিক্রি করে দেয় পাচারকারীরা। বিষয়টি বুঝতে পেরে দুই তরুণী কৌশলে পরিবারের সঙ্গে সেলফোনে বিষয়টি জানান। পরিবার রূপগঞ্জ থানায় মামলা করে। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ থেকে মানব পাচারকারী চক্রের স্থানীয় দুই সদস্যকে গ্রেফতার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিন্তু এ চক্রের আন্তর্জাতিক সদস্যরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনার কাজ করে বেসরকারি সংস্থা রাইটস যশোর। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক জানান, মানব পাচারের হটস্পট হয়ে ওঠা যশোরে পৃথক ট্রাইব্যুনাল করা হলে এ ধরনের মামলার ভুক্তভোগীরা ন্যায্য সেবা পাবেন।

মানব পাচার নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এম ইদ্রিস আলী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মানব পাচারের মামলা পরিচালনা করলে জট লেগে যায়।’

মানব পাচারের আরেকটি পুরনো রুট হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার। ২০১৫ সালে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় সহস্রাধিক বাংলাদেশীকে আটক করা হয়। অনেকে আবার পথে খাদ্য ও পানির অভাবে মারা যান। ওই বছর থাইল্যান্ডে গণকবর আবিষ্কৃত হয়। মানব পাচার রোধে কিছুদিন ব্যাপক তৎপর ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কিছুদিন বন্ধ ছিল মানব পাচার। সম্প্রতি আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে চক্রের সদস্যরা। ট্রলারে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাঠানোর জন্য পাচারকারীরা কক্সবাজার উপকূলের বেশ কয়েকটি পয়েন্ট ব্যবহার করছে। এগুলো হলো টেকনাফের শামলাপুর, শীলখালী, রাজারছড়া, নোয়াখালীপাড়া, জাহাজপুরা, শাহপরীরদ্বীপ, কাটাবনিয়া, মিঠাপানির ছড়া, জালিয়াপালং, ইনানী, হিমছড়ি, রেজুখাল, কুতুবদিয়াপাড়া, কক্সবাজার শহরের খুরুশকুল, চৌফলদি ও মহেশখালীর সোনাদিয়া, কুতুবজোম। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে স্থানীয়সহ বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা। তারা সবাই টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পের বাসিন্দা। এছাড়া মালয়েশিয়ায় অবস্থানকারী মানব পাচারকারী চক্রের বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা সদস্য জড়িত।

পুলিশ জানায়, বিদেশে নেয়ার জন্য যেসব রোহিঙ্গাকে টার্গেট করা হয় তাদের প্রত্যেক পরিবারের কাছ থেকে জনপ্রতি ২০-২৫ হাজার টাকা নেয় পাচারকারীরা। তবে একেকজনকে বিদেশে পাঠাতে খরচ পড়ে দেড় লাখ টাকার কাছাকাছি। রোহিঙ্গা নারীদের বিক্রি করে ওই টাকা তুলে নেয়া হয়। একেকজনকে ৪-৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়।

উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘‌রোহিঙ্গারা বিভিন্নভাবে পাচার হচ্ছে। এ বিষয়ে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ মাহমুদ আলী জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে মানব পাচারকারী চক্র কাজ করছে।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‌মানব পাচার আন্তঃসীমান্ত সমস্যা হলেও এখন মহামারী হয়ে গেছে। এটা এখন ব্যবসায় রূপ নিয়েছে।’

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ওসমান গনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌দালালরা রোহিঙ্গাদের থাইল্যান্ডে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে মালয়েশিয়ায় পাচার করে। পাচারকারী চক্র তাদের দুই-তিনদিন সাগরে ঘুরিয়ে অনেক সময় কক্সবাজার উপকূলে এসে জানায়, তারা থাইল্যান্ডে এসেছে। এ রকম অহরহ ঘটছে।’

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে মানব পাচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। তিনি জানিয়েছেন, দেশের সীমান্তবর্তী চার জেলার ১০টি পয়েন্ট মানব পাচারের রুট হিসেবে চিহ্নিত হলেও কোনোভাবে পাচার থামছে না। যশোরের বেনাপোল, পুটখালী, সাদীপুর, শিকারপুর, কৈজারি, বৈকারি, ভোমরা, কলারোয়া, কাকডাঙ্গা ও ঝিনাইদহের কয়েকটি পথকে মানব পাচারের রুট হিসেবে তুলে ধরে এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছাড়াও ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা পাচারকারীদের সঙ্গে জড়িত।

মানব পাচার প্রতিরোধ আইনের মামলাগুলো মনিটরিং করে পুলিশ সদর দপ্তরের স্পেশাল ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট শাখা। সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে হালনাগাদ তথ্যসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দেয়া হয়। প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মানব পাচার প্রতিরোধ আইনে মোট মামলা হয়েছে ৬ হাজার ৫৬৯টি। বিচার নিষ্পত্তি হচ্ছে ৪৩৬ মামলার। এর মধ্যে ২১টি মামলায় সাজা হয়েছে। খালাস হয়েছে ৪১৫টি মামলা। সাজা হওয়া মামলার মধ্যে সর্বোচ্চ সাজা দুজনের যাবজ্জীবন আর বাকি ১৯ জনের বিভিন্ন মেয়াদের। এ সময় খালাস পেয়েছে ১ হাজার ৬১৭ জন। মানব পাচার প্রতিরোধ আইনের ১৪৫টি মামলা ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচারাধীন। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন ৪৭৮টি মামলা। এসব মামলার অধিকাংশ সময়মতো সাক্ষী হাজির করতে না পারায় বিলম্বিত হয়ে চলেছে। 

মানব পাচার মামলায় ৯০ দিনে অভিযোগ গঠন এবং ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু ধীরগতির তদন্তে তা সম্ভব হচ্ছে না। বছরের পর বছর ধরে চলছে এসব মামলা। আবার বিচারে গিয়েও অধিকাংশ মামলায় হেরে যাচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষ। দুর্বল তথ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে অধিকাংশ মামলায় অপরাধীরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. আবদুল্লাহ আবু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মানব পাচার প্রতিরোধ আইনে মামলায় আসামি গ্রেফতার হয়। তদন্ত চলাকালে বাদী পক্ষ আর্থিক ক্ষতিপূরণ পেয়ে বিবাদীর সঙ্গে আপস করে। আবার অনেক মামলা ট্রায়ালে ওঠার পর ক্ষতিপূরণের ভিত্তিতে বাদী-বিবাদী আপস হয়। আপসকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।’

বিদ্যমান আইনে মানব পাচারে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেডআই খান পান্না। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘‌মানব পাচারের মামলায় আজ পর্যন্ত কোনো রিক্রুটিং এজেন্সি বা ট্রাভেল এজেন্সির সাজা হয়নি। কারণ অর্থের কাছে এসব আইন কিছুই না। পেনাল ল, পুলিশ অ্যাক্ট, সিআরপিসি, এভিডেন্স অ্যাক্ট হয়েছিল মূলত লুণ্ঠন, শোষণ ও নিষ্পেষণের জন্য। যাতে বেঙ্গল ও ভারতবর্ষ থেকে সম্পদ ইংল্যান্ডে অবলীলায় পাচার করা যায়। আমরা যদি এখন ১৮৬০ সালের আইন দিয়ে ২০২৪ সালে বিচার করতে চাই, তাহলে আইনের কঠোর প্রয়োগ সম্ভব না। এ আইন এখন ব্রিটেনেও নেই। এ আইনে যারা পাচারকারী তাদের সাজা হয় না। সাজা হয় মিডল ম্যানদের।’

পুলিশ সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) ইনামুল হক সাগর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মানব পাচারের মামলা তদন্তে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব নিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে। তবে পুলিশের যথাযথ ভূমিকার পাশাপাশি সাজার ক্ষেত্রে অভিযোগকারী ও সাক্ষী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’