টানা ভারি বর্ষণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে নগরজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। হাঁটুপানি থেকে কোথাও কোথাও কোমর সমান পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে নিচু এলাকার অসংখ্য দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে ক্ষতির মুখে পড়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে পাহাড়ি ঢল ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের পানি যুক্ত হওয়ায় দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। এছাড়া অব্যাহত বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ আশঙ্কা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে।

বৈরি আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরেও। চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে কনটেইনার ও জাহাজ হ্যান্ডলিং কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও বহির্নোঙর (আউটার অ্যাঙ্করেজ) এলাকায় বড় জাহাজে পণ্য ওঠানামা ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে অতি ভারি বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারেনি দুটি আন্তর্জাতিক ও একটি অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট।

মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর, যা চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ।

আবহাওয়া ও ভূপ্রাকৃতিক কেন্দ্র চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান বলেন, সম্প্রতি সৃষ্ট মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাব যুক্ত হওয়ায় বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েছে। নিম্নচাপটি ভারতের ঝাড়খণ্ড ও ওডিশা অঞ্চলে সরে গেলেও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে অন্তত আরো এক সপ্তাহ থেমে থেমে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি হতে পারে।

অবিরাম বর্ষণে নগরের আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, ফরিদার পাড়া, চান্দগাঁও, চকবাজারের তেলপট্টি গলি, কাট্টলী, হালিশহরের কে ব্লক, এল ব্লক, রামপুর, আনন্দীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। আগ্রাবাদ ও কাতালগঞ্জে হাঁটুপানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। ফলে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

ভারি বর্ষণের মধ্যে পতেঙ্গা এলাকায় একটি বাইপাস সড়ক ধসে পড়েছে। আউটার রিং রোডের সঙ্গে সংযোগকারী উড়ালসড়ক নির্মাণকাজ চলাকালে বিকল্প হিসেবে নির্মিত সড়কটি গতকাল রাতে ভেঙে যায়। এছাড়া নগরের বিভিন্ন স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।

বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইব্রাহীম খলিল জানান, আবুধাবি থেকে চট্টগ্রামগামী ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিএস-৩৫০ এবং শারজাহ থেকে চট্টগ্রামগামী এয়ার এরাবিয়ার জি৯-৫২৬ ফ্লাইট চট্টগ্রামে অবতরণ করতে না পেরে ঢাকায় অবতরণ করে। এছাড়া ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী বাংলাদেশ বিমানের বিজি-১২১ ফ্লাইটও আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় ঢাকায় ফিরে যায়।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাংলাদেশের ওপর মৌসুমি বায়ু সক্রিয় রয়েছে এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে তা প্রবল অবস্থায় রয়েছে। এর প্রভাবে চট্টগ্রাম বিভাগে থেমে থেমে বৃষ্টির পাশাপাশি কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হচ্ছে।

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আজ সকালে বিভিন্ন জলাবদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। তিনি পানি নিষ্কাশন তদারকির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের মেয়র বলেন, গতকাল শুরু হওয়া বৃষ্টির কারণে যেসব এলাকায় পানি জমেছে, সেসব এলাকার খাল পুনঃখনন ও সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে। বিশেষ করে হিজড়া খাল, জামাল খান খাল, আজব বাহার খাল ও গুলজার খালে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড কাজ করছে। কিছু কাজ এখনো বাকি থাকলেও দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন নালা পরিষ্কার করেছে।

টানা বর্ষণের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রভাব পড়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অধীন ৪৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আজ অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। নগরের আরো কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ছুটি ঘোষণা করেছে।

অন্যদিকে অব্যাহত বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে । চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বলেন, রোববার রাত থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় এলাকায় মাইকিং করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে অনুরোধ করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিয়া জানান, এরই মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢাল থেকে অন্তত ৩০টি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তাদের জন্য খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রাণহানি এড়াতে উদ্ধার ও সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নগরের ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী প্রায় ৬ হাজার ৫৫৫ জনকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এদিকে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের চারটি প্রকল্পে গত মার্চ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। প্রায় এক দশক ধরে প্রকল্পগুলোর কাজ চললেও অতি ভারি বর্ষণে এবারও নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ায় প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।