দক্ষিণাঞ্চলের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এমনিতেই এখানে রোগীর চাপ থাকে। তারপর ঋতু পরিবর্তনের এ সময়ে রোগীর চাপ আরো বেড়েছে। শয্যা সংকটের কারণে বারান্দার মেঝেতে রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। জরুরি অপারেশনের জন্যও অপেক্ষা করতে হয় দিনের পর দিন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, ১৯৮৮ সালে খুলনা নগরীর বয়রা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ২৫০ শয্যার এ হাসপাতাল। ১৯৯৬ সালে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর এর নাম পরিবর্তন হয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হয়। ২০০৮ সালে হাসপাতালটি ৫০০ শয্যা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। শয্যাসংখ্যা ৫০০ থাকলেও বর্তমানে প্রতিদিন রোগী ভর্তি থাকছে প্রায় ১ হাজার ৫০০। এ অবস্থায় সক্ষমতার তিন গুণ রোগীর কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না। এতে চিকিৎসকরা যেমন বিপাকে পড়েছেন, তেমনই দুর্ভোগ ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগী ও স্বজনরা।

গতকাল সকালে সরেজমিনে জরুরি বিভাগের সামনের সিঁড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠতেই দেখা যায়, বারান্দার মেঝের দুপাশে অসংখ্য মানুষ শুয়ে-বসে রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন রোগে আক্রান্তরা মাদুর, কাঁথা-বালিশ বিছিয়ে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। মেডিসিন ওয়ার্ডের পাঁচটি ইউনিটের বারান্দা, সার্জারি ওয়ার্ডের বারান্দার মেঝে, ২, ৩ ও ৪ তলায় লিফটের সামনে, ব্লাড ব্যাংকের সামনের বারান্দা, চিকিৎসকদের কক্ষের সামনের মেঝেতেও শুয়ে আছে অসংখ্য রোগী। মাঝখানের এক-দেড় ফুট খালি জায়গা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে রোগীর স্বজন ও হাসপাতালের লোকজন। এতে ধুলা উড়ে রোগীদের নাক, মুখ, চোখ ও খাবারের মধ্যে যাচ্ছে। রোগীর স্বজনরা বলছেন, হাসপাতাল থেকে জানানো হয়েছে শয্যা নেই। ফলে বাধ্য হয়েই মেঝেতে অবস্থান নিয়েছেন।

হাসপাতালের বহির্বিভাগে অপেক্ষমাণ খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বালিয়াঙ্গা থেকে আসা স্বপ্না খাতুন বলেন, তার মেয়ের পেটে ব্যথা হওয়ায় ডাক্তার দেখাতে এসেছেন। টিকিট কেটে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন, কিন্তু তখনো তার সিরিয়াল আসেনি।

দ্বিতীয় তলার বারান্দার মেঝেতে থাকা খুলনার পাইকগাছার সোলাদানা থেকে আসা শুকুর আলী বিশ্বাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে জানানো হয় শয্যা নেই। তাই বাধ্য হয়ে ১০ দিন ধরে হাসপাতালের বারান্দার মেঝেতেই আছি।’

তিনি বলেন, ডাক্তার দুটি টেস্ট করতে বলেছিলেন, একটি টেস্ট এখান থেকে করেছি। আরেকটি বাইরের ক্লিনিক থেকে করতে হয়েছে।

হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা দুই ভুক্তভোগীর অভিযোগ, দিনে মাত্র একবার ডাক্তার দেখতে আসেন। জরুরি প্রয়োজনে ডাকলে ইন্টার্ন চিকিৎসক বা নার্স আসেন। ডাকলে তারাও বিরক্ত হন।

এমন পরিস্থিতিতে কতিপয় চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার কথা বলে এসব রোগীকে বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বেসরকারি স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফি, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফাঁদে হয়রানির শিকার হচ্ছে রোগীরা। আর এর মাধ্যমে ওই চিকিৎসকরা হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের চুক্তিভিত্তিক কমিশন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের একাধিক বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালের কয়েকজন মালিক খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের এ কমিশন বাণিজ্যের কথা স্বীকার করে বলেন, এতে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। আর চিকিৎসা ব্যবস্থায় পরীক্ষার মান বিষয়ে কোনো ধরনের মনিটরিং না থাকায় আমাদের মধ্যে বাড়ছে কমিশন প্রতিযোগিতা।

তবে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. রবিউল হাসান হাসপাতালের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে রোগীদের বেসরকারি বিভিন্ন ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকে পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমাদের প্রয়োজনীয় জনবল নেই। ৫০০ শয্যা অনুযায়ী হাসপাতালের জনবল কাঠামো। চিকিৎসকের ২৮৮টি পদের মধ্যে ৯২টি পদ খালি। অন্যান্য পদ শূন্য রয়েছে ৪৩টি। দুটি অপারেশন থিয়েটারে অপারেশন টেবিল রয়েছে আটটি। এ অবস্থায় ভর্তি থাকা প্রায় ১ হাজার ৫০০ রোগীর পাশাপাশি বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০০ হাজার রোগীর চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

ডা. রবিউল বলেন, ভর্তি সব রোগীকে হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় খাবার দেয়া হলেও ৫০০ শয্যার জন্য বরাদ্দ ওষুধ দেড় হাজার রোগীকে দিতে হচ্ছে। শয্যাসংখ্যা কম থাকায় বাধ্য হয়েই অনেক রোগীকে মেঝেতে রাখতে হচ্ছে। তবে আরো ১ হাজার ৬৮টি শয্যা বৃদ্ধির প্রস্তাব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ১ হাজার ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি পূরণ হচ্ছে না। সেবাপ্রার্থীরা প্রত্যাশিত সেবা না পেয়ে হতাশ হচ্ছে। হাসপাতালে শয্যা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো জরুরি।