মেহেরপুরে চলতি মৌসুমে বাজারজাত করার সময়ে গ্রীষ্মকালীন বাঁধাকপিতে পাতা পচা, পোকা-মাকড়ের আক্রমণ ও পাতা পোড়া রোগ দেখা দেয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষীরা। কয়েক বছর ধরে ভালো ফলন ও দাম পাওয়ায় জেলার চাষীরা গ্রীষ্মকালীন বাঁধাকপি চাষের আওতা বাড়ান, কিন্তু নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ফলন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন তারা। ফলে কপি বিক্রি করতে না পারায় চাষীদের মোটা অংকের লোকসান গুনতে হচ্ছে। চাষীদের অভিযোগ, কৃষি অফিসের পরামর্শ থেকে তারা বঞ্চিত। আর কৃষি অফিস বলছে, আবহাওয়াজনিত কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষি অফিস চাষীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে মুজিবনগর, মেহেরপুর সদর ও গাংনী উপজেলায় ব্যাপক হারে গ্রীষ্মকালীন বা আগাম শীতকালীন বাঁধাকপি আবাদ হয়েছে। অর্থকরী ফসলের মধ্যে অন্যতম বাঁধাকপি। সারা বছরে এ কপি আবাদ হয়। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন কপি আবাদ চাষীদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক। লাভ বেশি
হওয়ায় অনেকেই এ বছর কপি চাষ করেছেন। প্রথমে কপি খেত বেশ ভালো দেখা গেলেও বাজারজাত করার সময় দেখা দেয় বিপত্তি। হঠাৎ নানা ধরনের ছত্রাক ও পাতা পচা রোগ দেখা দেয়। এ রোগে কপির গায়ে বিভিন্ন দাগ ছাড়াও পচনের কারণে বাজারে বিক্রি হচ্ছে না। ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করেও কোনো ফল পাচ্ছেন না চাষীরা। জেলার বিভিন্ন মাঠের অধিকাংশ খেতেই দেখা দিয়েছে পাতা পচাসহ নানা রোগ। এতে করে মোটা অংকের লোকসান গুনতে হবে কপি চাষীদের।
গাংনী উপজেলার গাড়াডোব মাঠের কপি চাষী নূর মোহাম্মদ জানান, এ বছর বিভিন্ন পণ্য ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় আবাদ খরচও বেড়েছে। এক বিঘা কপি আবাদে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকার বেশি। আর কপির ক্রেতা দাম বলছে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
গাংনী উপজেলার সাহারবাটি গ্রামের কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, অন্যান্য বছরে ছয়-সাতদিন বৃষ্টি থাকলেও পচে না বা কপির ক্ষতি হয় না। চলতি মৌসুমে পাতা পোড়া ও পচা রোগ দেখা দিয়েছে। জেলার প্রায় ৮০ ভাগ জমির কপি খেত নষ্ট হয়ে গিয়েছে। অধিকাংশ চাষীই ক্ষতিগ্রস্ত। আমাদের এলাকার বেশির ভাগ মানুষই কপি চাষের ওপর নির্ভশীল। তাই কপির নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ায় চাষীরা দিশেহারা।
এদিকে ব্যবসায়ী যারা আগেই অগ্রিম টাকা দিয়ে কপি কিনেছেন তাদের সঙ্গে চাষীর টাকা নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতি চার-পাঁচ বছরের মধ্যে দেখেননি বলে জানিয়েছেন এ কৃষক।
কপি খেতে রোগবালাই দেখা দেয়ায় পরামর্শ নিতে চাষীরা বিভিন্নজনের কাছে ছুটলেও সংশ্লিষ্ট এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার দেখা পান না বলেও অভিযোগ চাষীদের। বাধ্য হয়ে বিভিন্ন সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ীর পরামর্শ নিচ্ছেন চাষীরা। তবে কোনো ফল পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন নওপাড়া গ্রামের চাষী রহিদুল ইসলাম।
নওপাড়ার কৃষক আব্দুল জব্বার বলেন, শেষ মুহূর্তে পাতা পোড়া রোগ দেখা দেয়ায় এখন আর কপি বিক্রি হচ্ছে না। যে কপি ৬০-৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়, সেই কপি বিঘাপ্রতি ২০ হাজার টাকাও দাম বলছেন না ব্যবসায়ীরা।
সাহারবাটি গ্রামের কপি চাষী আলী হোসেন জানান, তিনি চলতি মৌসুমে দুই বিঘা জমিতে কপি চাষ করেছেন। এ পর্যন্ত জমি তৈরি থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। কপি বিক্রি করে ১ লাখ টাকা পাবেন বলে আশা করেছিলেন তিনি, কিন্তু শেষ সময়ে পাতা পচা রোগ দেখা দেয়ায় কপি বিক্রি করতে পারছেন না। এতে লোকসান গুনতে হবে বলে জানান তিনি।
গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লাভলী খাতুন জানান, আবহাওয়া অনুকূল না হওয়ায় গ্রীষ্মকালীন বাঁধাকপি চাষ ব্যাহত হচ্ছে। দিনে প্রচণ্ড গরম ও রাতে ঠাণ্ডা আবহাওয়ার কারণে কপি খেতে পচন দেখা দিয়েছে। চাষীদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন এ কৃষি কর্মকর্তা।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শঙ্কর কুমার মজুমদার জানান, কপির রোগ দমনে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। কর্মকর্তারা সবসময় মাঠে থাকছেন ও কৃষকের সঙ্গে কাজ করছেন।










