তিনি বলেন, ‘সরকারের মূল দর্শনই হলো ডেমোক্রেটাইজেশন অব ইকোনমি। আমরা পেট্রোনাইজড বা অলিগার্কিক অর্থনীতি থেকে সরে আসতে চাই। দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য যেন সমান সুযোগ থাকে, তারা যেন অর্থনীতিতে অংশ নিতে পারে এবং অর্থনীতির সুফল যেন সরাসরি তাদের কাছে পৌঁছয়।’
গতকাল রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে দৈনিক প্রথম আলো।
বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এতদিন একটি বিরাট জনগোষ্ঠী অর্থনীতির সুযোগ-সুবিধার বাইরে থেকে গিয়েছিল। অনেকে নানা সৃজনশীল কাজ করলেও ভ্যালু অ্যাড করতে পারছিলেন না। সেজন্য আমরা সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর জোর দিয়েছি। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কামার, কুমার, তাঁতিসহ যত ধরনের মানুষ সৃজনশীল কাজ করছেন, তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হতে পারছেন না। কোনো বাজেটে এদের সুনির্দিষ্ট টার্গেট গ্রুপ হিসেবে ভাবা হয়নি। আমরা এবার এ বিশাল অংশকে অর্থনীতির আওতায় নিয়ে আসছি। প্রান্তিক অঞ্চলের এসব মানুষকে আমরা আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেব। যেখানে দক্ষতার দরকার, সেখানে তা দেয়া হবে।’
দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন বা থিয়েটারের সঙ্গে জড়িতরাও কখনো বাজেটের মূল ধারায় আসেনি বলেও মন্তব্য করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা সাংস্কৃতিকভাবে এগোতে না পারায় আমাদের কোনো সফট পাওয়ার তৈরি হয়নি। পাশের দেশের ফিল্ম বা মিউজিক সারা দুনিয়ায় রাজত্ব করছে, অথচ বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। আমরা এদেরও এ ক্রিয়েটিভ ইকোনমির আওতায় নিয়ে আসতে চাই। এজন্য বড় শহরগুলোয় “থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট” করার পরিকল্পনা আছে।’
ব্যবসায়ীদের কোনো প্রতিষ্ঠান বা কারখানা খুলতে গেলে নানা জায়গা থেকে অনুমতি নিতে হয়। সবকিছুকে ‘ওয়ান স্টপ’ সেবার আওতায় নিয়ে আসা হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।
বর্তমান সরকারকে দুই বছরের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ের পরামর্শ দেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের আর্থিক সংকট তো আছেই, এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ভিশনেরও সংকট রয়েছে। আমাদের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলো এখন কাগুজে দলিল হয়ে গেছে। বাস্তবে সেগুলো থেকে খুব বেশি ফল পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারের উচিত দুই বছর মেয়াদি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা করা।’
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাজেটঘাটতি নিয়ন্ত্রণ করতে অপ্রয়োজনীয় করছাড় কমাতে হবে। বর্তমানে জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ করছাড় দেয়া হচ্ছে। জিডিপির এত বড় একটি অংশ যদি শুধু করছাড়েই চলে যায়, তাহলে অর্থনীতি আগাবে কীভাবে?’ পৃথিবীতে কোনো দিন শুধু আয়কর দিয়ে বৈষম্য দূর করা সম্ভব হয়নি মন্তব্য করে সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ওপর ‘ইনহেরিট্যান্স ট্যাক্স’ থাকা উচিত বলেও দাবি করেন তিনি।
বাজেটে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাবের বাইরে উন্নয়ন দর্শন থাকা উচিত বলে মনে করেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) প্রফেসরিয়াল ফেলো সেলিম জাহান। তিনি বলেন, ‘আমি বাজেটকে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা হিসেবে দেখতে চাই। এটি জনপ্রত্যাশা নয়, বরং জনপ্রয়োজন মেটানোর বাজেট হওয়া দরকার।’
বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বাড়াতে করছাড়ের চিন্তা করার আহ্বান জানিয়ে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাহবুব উর রহমান বলেন, ‘দেশের ঋণমান খারাপ হয়ে পড়েছে। এতে আমদানি খরচ বেড়ে যাবে। ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবেলায় এখনই বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ বাড়াতে হবে। ডলার না থাকলে কী হয়, আমরা তা দেখেছি। ভারতে ১০ বছর করছাড় রয়েছে। আমাদেরও করছাড়ের চিন্তা করতে হবে।’
আর্থিক খাতের সংস্কার নিয়ে কথা বলা সহজ, কিন্তু বাস্তবায়ন করা কঠিন বলে জানান ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার বিগত আমল থেকে যে ধরনের চ্যালেঞ্জ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, তার প্রভাব সরাসরি ব্যবসায়ীদের ওপর পড়ছে। ব্যবসায়ী সমাজ প্রতিদিন আর্থিক খাতের সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আর্থিক খাতের সংস্কার এখন সময়ের দাবি। এ সংস্কারগুলো করা সহজ কথা নয়, তবে আমাদের সঠিক সংস্কারের দিকেই এগোতে হবে।’
গোলটেবিল বৈঠকে আরো বক্তব্য দেন টি কে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার, নিট পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান, রাজধানীর মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা প্রমুখ। প্রথম আলোর অনলাইন হেড শওকত হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় সভায় বক্তব্য দেন পত্রিকাটির সম্পাদক মতিউর রহমান।










