কেউ অভিযোগ করুক বা না করুক নিজ উদ্যোগে দুর্নীতির অনুসন্ধানে নামতে বছর দুয়েক আগে একটি গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ নেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু সেটির কাজ এখনো শেষ হয়নি। ফলে কারো পক্ষ থেকে দুর্নীতির অভিযোগ না পাওয়া পর্যন্ত নিজ উদ্যোগে অনুসন্ধানে নামতে পারছে না কমিশন। ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪’-এর ১৭(গ)-তে দুদকের কার্যাবলিতে বলা হয়েছে, ‘দুর্নীতি সম্পর্কিত কোনো অভিযোগ স্বউদ্যোগে বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক দাখিলকৃত আবেদনের ভিত্তিতে অনুসন্ধান।’
দুদকের যাত্রা শুরু হয় ২০০৪ সালে। কিন্তু ‘স্বউদ্যোগে’ অনুসন্ধানের লক্ষ্যে গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয় ২০২২ সালে; ১৮ বছর পর। ওই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি নয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে দুদক সচিবের কাছে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় দেয়া হয় ১৫ কার্যদিবস। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় গেলেও প্রতিবেদন দাখিল করেতে পারেনি কমিটি।
২০২২ সালে দুদকের তৎকালীন সচিব মাহবুব হোসেনের সই করা এক অফিস আদেশে বলা হয়, ‘দুদক আইনের ১৭(গ) ধারায় উল্লেখিত স্বউদ্যোগে অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়ে সার্ভিলেন্স, গোয়েন্দা তথ্য বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য প্রো-অ্যাক্টিভ (সক্রিয়) প্রক্রিয়ায় অভিযোগ সংগ্রহের প্রক্রিয়া, পদ্ধতি এবং পরবর্তী প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেয়ার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হলো।’
কমিটির সভাপতি করা হয় দুদক মহাপরিচালক (তদন্ত-২) জাকির হোসেনকে। সদস্য সচিবের দায়িত্ব পান উপপরিচালক (অর্থ পাচার) এএসএম সাজ্জাদ হোসেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ‘স্বউদ্যোগে’ অনুসন্ধানের একটা খসড়া গাইডলাইন তৈরি করেছিল ওই কমিটি। কিন্তু সেটি আর চূড়ান্ত হয়নি। খসড়া গাইডলাইনে বলা হয়, কমিশনের দক্ষ, অভিজ্ঞ ও চৌকস কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি সেল গঠন করা হবে। এ সেলের দুটি শাখা থাকবে। একটি শাখা নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রাথমিক অভিযোগ তৈরি করবে। আরেকটি শাখার কাজ হবে অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের পর কমিশনের ব্যবহার উপযোগী করে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা। এ সেল দুদকের গোয়েন্দা ও এনফোর্সমেন্ট ইউনিটসহ অন্যান্য ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে। গাইডলাইন তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক মহাপরিচালক (তদন্ত-২) জাকির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাজ চলমান।’
‘স্বউদ্যোগে’ অনুসন্ধানের ব্যাখ্যায় দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন) মঈদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কারো অভিযোগের আশায় দুদক বসে থাকবে না; দুর্নীতির ঘটনা নিজেরাই খুঁজে বের করবে—এটাই হলো স্বউদ্যোগ। কিন্তু অনুসন্ধানের সিংহভাগই নেয়া হয় দায়ের হওয়া অভিযোগ থেকে। সেগুলোয় বড়সড় দুর্নীতির খবরের চেয়ে বেশি থাকে ছোটখাটো ঘটনা আর ব্যক্তিগত আক্রোশ।’
মঈদুল ইসলাম মনে করেন, ‘বড় বড় দুর্নীতি ধরতে হলে দুদকের নিজস্ব গোয়েন্দা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিশ্চিত তথ্য সংগ্রহে জোর দিতে হবে।’
‘স্বউদ্যোগ’ অনুসন্ধানের একটা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন দুদক কমিশনার (তদন্ত) মো. জহুরুল হক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বউদ্যোগ বলতে সাংবাদিকদের করা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনুসন্ধানকেই বোঝায়।’
কোনো ধরনের সংবাদমাধ্যমে না এলে সেক্ষেত্রে দুদকের করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে জহুরুল হক বলেন, ‘এমন হলে বিশেষ কিছু করা হয়। তবে এটা খুব বেশি করা হয় না, কারণ আমরা তো জানি না। আমরা কীভাবে জানব, সোর্স তো পেতে হয়।’ দুদক কর্মকর্তাদের সোর্স মানি পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সোর্স মানি দিয়ে আমরা কী করব! সোর্স মানি দিয়ে তো সোর্স পাওয়া যায় না।’
‘স্বউদ্যোগে’ অনুসন্ধানের ব্যাখ্যায় দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরেই দুদক বেশির ভাগ অনুসন্ধান করে। এটাই স্বউদ্যোগ।’










