খুলনার দাকোপ উপজেলায় ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডারে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধের কাজ শেষ হওয়ার আগেই ভাঙন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীশাসন না করে বাঁধ নির্মাণের কারণে সংস্কারকাজ টেকসই হচ্ছে না। এতে করে জলে যেতে বসেছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।

দাকোপ উপজেলার কামারখোলা ইউপি চেয়ারম্যান পঞ্চানন মণ্ডল বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে যে নতুন বাঁধ হচ্ছে, তার সুফল পেতে অবশ্যই নদীশাসন করতে হবে। তাহলে দুর্যোগপ্রবণ এ এলাকার মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিইআইপি-১ প্রকল্পের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, প্রকল্পের শুরুতে নদীশাসনের বিষয়টি ছিল না। প্রকল্পের কাজ প্রাথমিকভাবে শুরু হওয়ার পর ২০১২-১৩ অর্থবছরের সমীক্ষা অনুযায়ী ২ কিলোমিটারের কিছু বেশি বাঁধে নদীশাসন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যখন সমীক্ষা করা হয়েছিল তখন নদীর গতিপ্রকৃতি যেমন ছিল, এখন তেমন নেই। এখন আরো ১০-১২ স্থানে ভাঙন লেগেছে। সে কারণে আরো সাত কিলোমিটার বাঁধ নদীশাসনের জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ওখানে ব্লক ও জিও ব্যাগ ফেলা হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার মোট ১৭টি পোল্ডার সংস্কার করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পের নাম উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প, ফেজ-১ (সিইআইপি-১)। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। এ প্রকল্পের আওতাভুক্ত জেলাগুলো হলো—খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, বরগুনা, পিরোজপুর ও পটুয়াখালী।

এর মধ্যে খুলনার দাকোপ উপজেলায় রয়েছে ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডার। ৩২ নম্বর পোল্ডারে প্রায় ৫০ কিলোমিটার বাঁধের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাঁধের উন্নয়ন, বিকল্প বাঁধ ও নদীশাসন। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শেষ না হতেই কোনো কোনো স্থান দুবার ভাঙনের কবলে পড়েছে। এলাকাবাসী বলছেন, বাঁধের এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট এলাকার ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫০ একর জমির ফসল আছে ঝুঁকির মুখে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকী নদীর তীব্র স্রোতের তোড়ে দাকোপ উপজেলার ৩২ নম্বর পোল্ডারের কামারখোলার হাটখোলা গেটসংলগ্ন প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় বেড়িবাঁধে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। খেয়াঘাট এলাকায় ভদ্রা নদীর স্রোতে বাঁধে দেয়া ব্লক সরে যাচ্ছে।

এলাকাবাসী জানান, ঢাকী, শিবসা ও ভদ্রা নদীতীরে বাঁধ দেয়ার কারণে এ এলাকার নদনদী থেকে কৃষিজমিতে লবণপানি ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ওইসব এলাকায় তরমুজ চাষ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে বড় বড় নদীবেষ্টিত হওয়ায় প্রতি বছরই ভাঙনের কবলে পড়ে এখানকার বেড়িবাঁধ।

এলাকাবাসী বলেন, ৩২ নম্বর পোল্ডারটি কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়নের ১৪টি গ্রাম ছুঁয়ে গেছে। ওই দুটি ইউনিয়নে বসবাস প্রায় ৬০ হাজার মানুষের। এখানে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর কৃষিজমি রয়েছে। বছরের পর বছর সেখানে হয়েছে লবণ পানির চিংড়ি চাষ। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলায় সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে ইউনিয়ন দুটির অসংখ্য বাড়িঘর বিধ্বস্তসহ লবণপানিতে তলিয়ে যায় ফসলের খেত। তখন টেকসই বাঁধের প্রয়োজন দেখা দেয়। তারপর বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধের কাজ শুরু করে।

কাজ শুরু হওয়ার পর গত দুই বছরে কামারখোলা ও সুতারখালী ইউনিয়নের বেড়িবাঁধের একাধিক স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। ওই এলাকার বাসিন্দা এসএম রমজান আলী বলেন, সম্প্রতি ৩২ নম্বর পোল্ডারের অন্তত ১০টি স্থান প্রায়ই ভাঙনের কবলে পড়ছে। অন্যান্য এলাকার বাঁধও মাঝে মাঝে ভেঙে যায়। যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে। নদীশাসন না করে বাঁধ নির্মাণ করায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।