বাইসাইকেল চালিয়ে কালাচাঁদপুরে কর্মস্থলের দিকে যাচ্ছিলেন নুরুল ইসলাম মাস্টার। গুলশান এভিনিউ রোডে পৌঁছলে পেছন থেকে আসা দ্রুতগামী একটি গাড়ি তাকে ধাক্কা দেয়। মারাত্মক আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে নেয়া হয় নিকটস্থ কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। কিন্তু কভিড-১৯ টেস্ট রিপোর্ট ছাড়া তার চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয় বলে ফিরিয়ে দেয়া হয়। পরে আরো দুটি হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যান তিনি।

দেশে কভিড সংক্রমণের আট মাস পর মারাত্মক আহত রোগীকে চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়ার ঘটনাটি অপ্রত্যাশিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে চিকিৎসকদের দাবি, কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনেই কভিড টেস্ট করিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

১০ নভেম্বর দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর চিকিৎসা না পেয়ে ৭৬ বছর বয়সী নুরুল ইসলাম মারা যান। এ ঘটনায় তার ছেলে মো. খায়রুল ইসলাম মতি বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, দুর্ঘটনার পর মারাত্মক আহত অবস্থায় তার বাবাকে পথচারীরা উদ্ধার করে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যান। তিনিও দ্রুত সেখানে পৌঁছান। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারেন তার বাবার করোনা টেস্ট রিপোর্ট না থাকায় চিকিৎসা দিতে অপারগতা জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। পরে পঙ্গু হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানেও প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রেফার করা হয় বক্ষ্যব্যাধি হাসপাতালে। সেখানে পৌঁছানোর পর পরই মারা যান তিনি।

মো. খায়রুল ইসলাম মতি অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনাকবলিত হওয়ার পর তার বাবার প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এ অবস্থায় তার চিকিৎসা পাওয়াটা খুবই জরুরি ছিল। কিন্তু হাসপাতালগুলো থেকে করোনা টেস্ট না করানো পর্যন্ত চিকিৎসা দিতে রাজি হচ্ছিল না। অন্যদিকে করোনা টেস্ট করাতে দিলেও তার রিপোর্ট পেতে যথেষ্ট সময় লাগে। গুরুতর জখম অবস্থায় জরুরি চিকিৎসা না দিয়ে তার করোনা টেস্ট করাতে বলেন চিকিৎসকরা। এভাবে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল ঘুরতে ঘুরতে নুরুল ইসলামের প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি মারা যান।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. নাসিমা সুলতানা বণিক বার্তাকে বলেন, কুর্মিটোলা জেনারেলটি কভিড ডেডিকেটেড হওয়ায় সেখান থেকে নুরুল ইসলাম মাস্টারের রক্তক্ষরণ বন্ধে ব্যান্ডেজ করে অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হওয়ার কারণে কিছু সমস্যা হচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। প্রকোপ শুরুর পর থেকে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ক্যান্সার, প্রসূতি মায়ের সেবা, দুর্ঘটনায় আহতসহ অন্যান্য রোগের চিকিৎসা মিলছে না বলে রোগীরা অভিযোগ করছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগ খোলা থাকলেও বহির্বিভাগ থাকে আধাবেলা। ফলে সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য রোগীরা কোথায় যাবেন তা এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না।

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, সাধারণ রোগ কিংবা দীর্ঘদিন ধরে কোনো অসুস্থতায় ভোগা রোগীদের চিকিৎসা প্রায় বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে যারা দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সার, কিডনি, ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য রোগে ভুগছেন, তারাও প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছেন না। কেউ জ্বরে আক্রান্ত হলেও তাকে করোনায় আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। শ্বাসকষ্টের কথা জানালে তো মহাবিড়ম্বনা। কিছুতেই সেই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি নিচ্ছে না বেসরকারি থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি হাসপাতালও।

চিকিৎসকরা বলছেন, পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়াই চিকিৎসকদের সেবা দিতে হচ্ছে তাদের। রয়েছে পিপিই সংকট। দেয়া হয়নি এন৯৫ বা সমমানের মাস্ক। এসব বিষয় মাথায় রেখে যেকোনো রোগীর চিকিৎসা দেয়ার আগে কভিড-১৯ টেস্ট অত্যন্ত জরুরি। সেজন্যই হাসপাতালে সেবা নিতে আসা সব রোগীকেই কভিড টেস্ট করে আসতে বলা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ডা. খুরশীদ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে করোনা সনদ নিয়ে চিকিৎসা প্রদানের কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল বর্তমানে কভিড ডেডিকেটেড হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় সেখানে একটু বাড়তি সতর্কতা অনুসরণ করা হয়। এর পরও জরুরি রোগীর চিকিৎসা দেয়ার জন্য সেখানে ব্যবস্থা রয়েছে। জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে তাকে যথাযথ চিকিৎসা দিয়ে অন্য হাসপাতালে দ্রুত স্থানান্তর করতে হবে।