কুষ্টিয়া শহরের একটি বহুতল ভবনের পার্কিং থেকে বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করেছে কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশ। সোমবার রাত ১টার দিকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনের বহুতল ভবন সাফিনা টাওয়ারের পার্কিং জোন থেকে গাড়িটি জব্দ করা হয়। গাড়ির কাগজপত্র, সংসদ সদস্য ও সিআইপি স্টিকার উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাতে গাড়ির নম্বর, ইঞ্জিন নম্বর, চ্যাসিস নম্বরসহ ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম ওরফে আনারের নাম লেখা রয়েছে।
গত বছরের ১২ মে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যান তৎকালীন এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার। ১৬ মে নিখোঁজ হন তিনি। ২২ মে তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে খবর শোনা যায়। পরে পুলিশ জানায়, আনারকে হত্যার পর টুকরো টুকরো করা হয়। পরে সেগুলো বিভিন্ন জায়গায় ফেলে দেয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী মেহেদী জানান, মাঝে মধ্যে গাড়িটিতে স্টার্ট দেয়া হতো। তবে কে বা কারা দিত বলতে পারেননি তিনি। এমন একটি দামি গাড়ি এখানে ছিল এটা অনেকেই জানতেন। তবে কেউ বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামাননি। কারণ এ ধরনের গাড়ি শহরে আরো রয়েছে।
সাফিনা টাওয়ারের কেয়ারটেকার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘জেনুইন লিফ কোম্পানি নামে একটি সিগারেট কোম্পানি দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় বাসা ভাড়া নিয়েছে। সেখানে বিদেশীরা আসা-যাওয়া করেন। তারাই গাড়িটি রাখার ব্যবস্থা করেছেন। জেনুইন লিফ কোম্পানির জিএম বেলাল হোসেন ও সিইও জাহিদ হোসেন। এর বেশি আমি জানি না।’
জানা গেছে, জেনুইন লিফ কোম্পানির মালিক আব্দুস সবুর লিটন। তার বাড়ি চট্টগ্রামে। নরসিংদী জেলায় তারা টোব্যাকো নামে ব্যবসা পরিচালনা করেন তিনি। এছাড়া সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেল চৌধুরীর সঙ্গে বিজয় টোব্যাকো নাম দিয়ে একসঙ্গে ব্যবসা করতেন লিটন। দৌলতপুর উপজেলায় তারা ও বিজয় টোব্যাকোর নামে তামাক কিনতেন তিনি। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বেশ কিছুদিন তামাক কেনা বন্ধ থাকে। পরে দৌলতপুর উপজেলার বিএনপির দুই নেতার ছত্রছায়ায় লিটন নতুন করে ব্যবসা শুরু করেন ভেড়ামারায়।
ধারণা করা হচ্ছে, গাড়িটি আওয়ামী লীগের কোনো নেতার কাছে ছিল, যার সঙ্গে লিটনের সখ্য রয়েছে। সাফিনা টাওয়ারে লিটনের সিইও হিসেবে কাজ করেন জাহিদ হোসেন নামে আরেক ব্যক্তি। এছাড়া বেলাল হোসেন নামে একজন জিএমও রয়েছেন।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য সাফিনা টাওয়ারের মালিক, জেনুইন লিফ টোব্যাকোর সিইও জাহিদ ও জিএম বেলালের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাদের পাওয়া যায়নি। তাদের অফিসে গিয়ে কেয়ারটেকার ও দারোয়ান ছাড়া কাউকে পাওয়া যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন ও মালিকানাপত্রে আনোয়ারুল আজীম আনারের নাম উল্লেখ রয়েছে। সাফিনা টাওয়ারের ফ্ল্যাট মালিক ও ভাড়াটিয়ার চুক্তিপত্র অনুযায়ী মেহেরপুর জেলার গাংনী পৌরসভার বাঁশবাড়িয়া দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা মো. মুস্তাফিজুর রহমান ভবনের তিনটি ইউনিট ও তিনটি গাড়ির পার্কিং স্পেস ভাড়া নেন। গাড়িটি বর্তমানে মুস্তাফিজুর রহমানের পার্কিং স্পেসে রয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ভাড়া নিয়েছেন তিনি। মুস্তাফিজুর রহমান কুষ্টিয়ার দশমাইল এলাকায় অবস্থিত তারা টোব্যাকোর শেয়ারহোল্ডার।
জেনুইন লিফ কোম্পানির গাড়িচালক শান্ত বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘জেনুইন লিফ কোম্পানির জিএম বেলাল ও সিইও জাহিদ তাকে ওই গাড়ির চাবি দিয়ে স্টার্ট দিতে বলেন। তাদের নির্দেশে মাঝে মধ্যে গাড়িটি স্টার্ট দেয়া হতো।’
তবে গাড়ির মালিক কে এসব বিষয়ে তার ধারণা নেই। গাড়িটি কখনো চালানো হয়নি বলে তিনি জানান।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ভবনের আরেক নিরাপত্তা প্রহরী জানান, সিগারেট কোম্পানির অফিসের কর্মকর্তারা গাড়িটি রেখেছেন বেশ কয়েক মাস আগে। গাড়িটি বাইরে বের করা হয় না সেভাবে। তবে মাঝে মধ্যে স্টার্ট দেয়া হয়। চালক শান্ত গাড়ি স্টার্ট দেন।’
এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি মোশাররফ হোসেন জানান, গাড়ির কাগজপত্র, সংসদ সদস্য ও সিআইপি স্টিকার উদ্ধার করা হয়েছে। কাগজপত্রে সাবেক এমপি আনারের নাম রয়েছে। গাড়িটি বেশ কয়েক মাস আগে ওই বাড়ির গ্যারেজে রাখা হয়। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
আনোয়ারুল আজিমের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস দাবি করেছেন, গাড়িটি তার বাবার ব্যবহৃত। যেটি তিনিও ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন সময়ে। তিনি জানান, তার বাবার হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ও তার পরিবার গাড়িটির খোঁজ করেছেন। কিন্তু কোনো তথ্য পাননি। গাড়িটি তার পরিবার ফিরে চায় বলে জানান মুমতারিন। গাড়িটি উদ্ধারের জন্য তিনি আইনের আশ্রয় নেবেন।
জানতে চাইলে কুষ্টিয়া পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) ফয়সাল মাহমুদ জানান, একাধিক ইস্যু নিয়ে কাজ করছে পুলিশ। সাবেক এমপি আনার হত্যা মামলা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের যেসব টিম কাজ করছে, বিষয়টি তাদেরও জানানো হয়েছে।










