নতুন করে বৃষ্টিপাত বা উজানের ঢল না আসায় কমতে শুরু করেছে পদ্মা নদীর পানি। তবে পানি কমার সঙ্গে তীব্র আকার ধারণ করেছে নদীভাঙন। কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পদ্মার ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ভূরকা-হাটখোলা থেকে কোলদিয়াড় পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দেখা দিয়েছে ভাঙন। এরই মধ্যে কয়েকশ বিঘা চার ফসলি জমি, ফলের বাগান ও বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রায়টা-মহিষকুণ্ডী নদী রক্ষা বাঁধ এবং ভারত থেকে আসা ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ কয়েকটি গ্রামই নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পদ্মা প্রতি বছর বর্ষায় তার রূপ বদলায়। পানি কমে যাওয়ার পরই শুরু হয় ভাঙনের নতুন অধ্যায়। এমন কোনো বছর নেই, পদ্মার ভাঙন কম পরিলক্ষিত হয়েছে।

নদীপারের বাসিন্দারা জানান, এ বছর পদ্মার ভাঙন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। স্রোতধারা হয়েছে আরো ক্ষিপ্র। যার ফলে মুহূর্তেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি, বসতঘর। পদ্মার এ ভাঙন কেবল নদীর নয়, মানুষের জীবিকাও ভেঙে দিচ্ছে।

কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সুমন আলীর পরিবার কয়েক দফার ভাঙনে অন্তত ১৫ বিঘা জমি হারিয়েছে। গত সপ্তাহেই নদীতে বিলীন হয়েছে তাদের আরো এক বিঘা জমি। শিক্ষার্থী সুমন বলেন, ‘প্রতিদিন ভাঙছে জমি, মানুষ হারাচ্ছে তাদের জীবিকা। এভাবে চললে নদীতীরের গ্রামই মিশে যাবে।’

দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের ভূরকাপাড়া গ্রামের কৃষক সাহেদ হাসান বলেন, ‘আগে পাঁচ বিঘা জমি গেছে, এবার আরো পাঁচ বিঘা নদীতে হারালাম।’

গাঙ্গেয় ধারার এ নদী ব্রহ্মপুত্রের এক ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশে প্রবেশের পর এটি রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও মাদারীপুর জেলাজুড়ে প্রবাহিত হয়ে আরিচা ঘাটের কাছে যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এ মিলনস্থলকে বলা হয় গোয়ালন্দ মোহনা। এখান থেকে মিলিত প্রবাহ দক্ষিণে মেঘনা নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। পদ্মা নদীর অর্থনৈতিক মূল্য অপরিসীম। দেশের এক বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এ নদী কৃষি উৎপাদনের প্রাণ। বন্যা ও পলি জমে উর্বর করে তুলেছে দেশের বিশাল ভূমি। একই সঙ্গে এ নদী ক্ষয়ক্ষতিরও কারণ।

স্থানীয়রা জানান, কুষ্টিয়ার রায়টা-মহিষকুণ্ডী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, ভূরকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়াড় মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কোলদিয়াড় ও কান্দিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জুনিয়াদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, হাটখোলাপাড়া জামে মসজিদ, জুনিয়াদহ বাজারও পদ্মার ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।

কোলদিয়াড় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবুল হোসেন বলেন, ‘ফসলের মাঠ পেরিয়ে নদী এখন বাঁধের কাছে চলে এসেছে। প্রতিদিনই ভাঙছে তীর, হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের ঘরবাড়ি। দ্রুত স্থায়ী বাঁধ না দিলে পুরো গ্রাম নদীতে তলিয়ে যাবে।’

এদিবে ভাঙন রোধে মানববন্ধন করেছে নদীপারের বাসিন্দারা। শনিবার বিকালে দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নের কোলদিয়াড় গ্রামে নদীর পারে এ কর্মসূচি আায়োজন করা হয়। এ কর্মসূচির আহ্বায়ক আতার হক ফরাজী বলেন, ‘দুই বছরে আমার পরিবারের ৫০ বিঘার বেশি জমি পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি, এখন শুধু ঘরবাড়ি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ঘেরাও করব।’

ভাঙনকবলিত এলাকায় জরুরি উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাই সিদ্দিকী বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। ভাঙন রোধে জরুরি পদক্ষেপ নিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।’

এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সম্প্রতি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ভাঙন রোধে স্থায়ী ও অস্থায়ী প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’

দুই সপ্তাহ ধরে পদ্মার পানি কমতে থাকায় ভাঙন বাড়ছে রাজশাহীতেও। গোদাগাড়ী উপজেলার নিমতলা, আষাঢ়িয়াদহ, নগরীর পঞ্চবটী থেকে তালাইমারী, চারঘাটের টাঙ্গন ও বাঘার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এসব এলাকায় নেই কোনো স্থায়ী বাঁধ। বর্ষা মৌসুমে অস্থায়ী বাঁধগুলো নদীর প্রবল স্রোতে দুর্বল হয়ে পড়ে; ফলে পানি নামার সময় দ্রুতই সেগুলো ভেঙে যায়। আষাঢ়িয়াদহ ইউনিয়নের চারটি গ্রাম এ বছর অন্তত ৪০ মিটার করে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। চর ছেড়েছে প্রায় ১৫০টি পরিবার।

চর আষাঢ়িয়াদহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম ও গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।